যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় হামের জটিলতায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর রাজ্যটিতে হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে। একই সময়ে রাজ্যজুড়ে ৬০০-র বেশি মানুষের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
মিফ্লিন কাউন্টির করোনার কার্যালয় জানিয়েছে, ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ হামের বিরল ও গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা অ্যাকিউট এনসেফালোমাইলাইটিস-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
‘কিস্টোন স্টেট’ নামে পরিচিত পেনসিলভেনিয়ায় এ বছর শনাক্ত হওয়া হামের অধিকাংশ ঘটনাই ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে হামজনিত জটিলতায় মারা যাওয়া ১৮ ও ৪০ বছর বয়সী দুজনই টিকাবিহীন ছিলেন।
এর বাইরে রাজ্যটিতে দুই শিশুরও মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সাধারণত ১২ মাস বয়সে প্রথম এমএমআর টিকা দেওয়া হয়। ফলে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা টিকা পাওয়ার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।
হামের বিরুদ্ধে ব্যাপক টিকাদানের ফলে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রোগটি নির্মূলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকা নেওয়া নিয়ে মানুষের দ্বিধা বাড়ায় টিকাদানের হার কমেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় হামের সংক্রমণ ফের বেড়েছে। চলতি বছর দেশটি ১৯৯০-এর দশকের পর সবচেয়ে বেশি হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে।
গত বছর টেক্সাসে হামের একটি প্রাদুর্ভাবে তিনজন মারা যান, যাদের মধ্যে দুইজন শিশু। ওই সংক্রমণ মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি এনসেফালাইটিসসহ বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগোষ্ঠীতে কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদানের আওতায় থাকা প্রয়োজন।
পেনসিলভেনিয়ায় সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো নিয়ে রাজ্যের গভর্নর জশ শাপিরো ও স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। শাপিরো অভিযোগ করেছেন, কেনেডি টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন এবং মৃতদের পরিবারের স্বার্থে হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর তথ্য গোপন রাখার বিষয়ে তিনি স্বাস্থ্য সচিবকে সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে, কেনেডি প্রশ্ন তুলেছেন, দুই শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে হামকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরা যায় কি না। প্রথম দুই মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি শাপিরোর বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামির’ অভিযোগও করেন।
গত শনিবার জেফারসন কাউন্টিতে ৪০ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামজনিত শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির করোনার স্টিভেন ডায়ামান্টোনি জানান, গত ১৮ আগস্ট হামে আক্রান্ত ছয় সপ্তাহ বয়সী একটি শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি জন্মগতভাবে ‘অ্যামিশ লেথাল মাইক্রোসেফালি’ নামের বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত ছিল।
আরেক আক্রান্ত শিশু জন্মের পরপরই, ১৪ আগস্ট মারা যায়। প্রাথমিকভাবে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্লীহা ফেটে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, হামের সংক্রমণে প্লীহা বড় হয়ে যেতে পারে, ফলে তা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তদন্তে ওই শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে হাম সংক্রমণের সম্পর্কও নিশ্চিত করা হয়েছে।
পেনসিলভেনিয়া স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দুই শিশুর মৃত্যু হামের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না তা যাচাই করতে করোনার কার্যালয়গুলোর সঙ্গে বিস্তারিত তদন্ত করা হয়েছে। এতে রোগীর ক্লিনিক্যাল লক্ষণ, পরীক্ষাগারে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ এবং মৃত্যুর অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
কেনেডি জানিয়েছেন, মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে পর্যালোচনা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) আনুষ্ঠানিক তথ্য হালনাগাদ করবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো হামের নির্মূল মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে কি না, সে বিষয়ে আগামী নভেম্বর একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। কানাডা গত বছর এই মর্যাদা হারিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ কেনেডির বক্তব্য এবং মার্কিন টিকানীতিতে পরিবর্তনের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে। কেনেডি নিজে টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও এমএমআর টিকা হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধে নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
গত মাসে এক সিনেট কমিটির শুনানিতে কেনেডি বলেন, হামের নির্মূল মর্যাদা হারিয়েছে এমন দেশের সংখ্যা বাড়ছে এবং বিশ্ব বর্তমানে বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হামের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।