মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

গাজায় মিলছে নিখোঁজদের মরদেহ

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও প্রাণহানি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই গাজায় চলমান নৃশংসতার ঘটনায় মার্কিন সরকারের অংশীদারত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তলাইব। তার অভিযোগ, মার্কিন নির্মিত প্রাণঘাতী অস্ত্রের আঘাতেই গাজায় বহু শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তলাইব বলেন, গাজায় ‘গণহত্যা এখনো চলছে’। তার ভাষ্য, মার্কিন নির্মিত বোমার আঘাতে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে এবং যারা বেঁচে থাকছে, তাদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। জাতিগত নিধনের মতো এসব কর্মকা-ে মার্কিন প্রশাসনের সব ধরনের সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

গাজা নিয়ে তথ্যচিত্রে তীব্র প্রতিক্রিয়া ইসরায়েলে : গাজায় সাধারণ মানুষের গণহারে হত্যার অভিযোগ ও এর পেছনে সামরিক ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’ ঘিরে ইসরায়েলে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তথ্যচিত্রটির দুই ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল জোরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী মিকি জোহার। মন্ত্রী অভিযোগ করেন, দুই পরিচালক বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষীদের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নিজেদের মাতৃভূমির ক্ষতি করতেও প্রস্তুত। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন। তথ্যচিত্রটির নাম ‘নাজা’ নেওয়া হয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহৃত একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ থেকে। এই শব্দের মাধ্যমে গাজায় কোনো বিমান হামলায় আনুমানিক কতজন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হতে পারে, তা বোঝানো হয় বলে তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার অভিযোগ : প্রায় ৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এতে গাজায় বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণব্যবস্থা ব্যবহারের অভিযোগ এবং এর ফলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

তথ্যচিত্রের একটি সাক্ষাৎকারে এক সূত্র দাবি করেন, মাত্র একজন হামাস সদস্যকে হত্যার জন্য ৫০০ জন বেসামরিক মানুষ হত্যার অনুমোদন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল।

তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুরুতে তথ্যচিত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলো পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। একই সঙ্গে বেনামি সাক্ষ্য ব্যবহারের সমালোচনা করে তারা দাবি করে, তথ্য ফাঁসকারীদের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব নয়। পরে সামরিক বাহিনী অন্য এক প্রতিক্রিয়ায় জানায়, অভিযোগগুলো শুধু উড়িয়ে না দিয়ে বিস্তারিত ও প্রমাণভিত্তিক জবাব দেওয়া প্রয়োজন।

ভেনিসে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সম্মান : তথ্যচিত্রটির প্রদর্শন হয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। প্রদর্শনের পর দর্শকেরা টানা ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান জানান, যা উৎসবটির ইতিহাসে একটি রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তথ্যচিত্রটি উৎসবের বিশেষ বিচারক পুরস্কার লাভ করে। তথ্যচিত্রের দুই পরিচালক এর আগে অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ও তাদের ওপর চলা নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা ‘নো আদার ল্যান্ড’ নির্মাণের জন্য আলোচনায় এসেছিলেন। ২০২৫ সালে এই তথ্যচিত্রের জন্য তারা অস্কার পুরস্কারও পান।

নাগরিকত্ব বাতিলের আইনি সুযোগ : ইসরায়েলে আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব বাতিল করা সম্ভব হলেও এ ক্ষমতা খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ২০২২ সালে জানান, কেউ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখাতে ব্যর্থ হলে, যেমন গোয়েন্দাগিরি বা রাষ্ট্রদ্রোহে জড়িত হলে, রাষ্ট্র নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে। ২০২৩ সালে আইনটি আরও বিস্তৃত করা হয়।

পশ্চিম তীরে বাড়ছে ইসরায়েলি বসতি : গাজা নিয়ে তথ্যচিত্রের বিতর্কের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অবস্থান অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি ভূখ-ে এসব ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বসতিবিরোধী সংগঠন পিস নাওয়ের তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অন্তত ১৪৮ এবং পূর্ব জেরুজালেমে ১৫টি ইসরায়েলি বসতি রয়েছে। এসব বসতিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ইসরায়েলি বসবাস করছে। বসতিগুলোকে কেন্দ্র করে সড়ক, মহাসড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৩৬ হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যেখানে ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৫২। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ১৩১ হামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আরও ১ হাজার ৪১৮ হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো চাপা বহু লাশ : গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজ ধীরগতিতে চলছে। গত রোববার ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের নিচ থেকে আরও ১৭ ফিলিস্তিনির মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গাজার নাগরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, উত্তর ও মধ্য গাজার বিভিন্ন এলাকায় এই উদ্ধার অভিযান চলছে। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির সংকটে কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে। গাজা সিটির জেইতুন ও ইয়ারমুক এলাকায় দুটি পরিবারের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে আরও একজনের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। উদ্ধারকারী দলগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপে গাজা, উত্তর গাজা ও মধ্যাঞ্চলের ১৪৭টি ধ্বংস হওয়া বাড়ি ও স্থাপনায় অনুসন্ধান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রায় ১ হাজার ৭২ লাশ চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম ধাপে ৫৪টি বাড়ি ও ভবনে অনুসন্ধান চালিয়ে ৫৫৯ জন নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ৩৩৩ জনের মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছিল। গাজা থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছিল, ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ, নতুন করে উদ্ধার অভিযান এবং গাজা নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ঘিরে বিতর্কÑ সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনি ভূখ-ের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102