কর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনার পর এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন বাজেটে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্যসহ ভিআইপি ব্যক্তিদের ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর আর কর ছাড় রাখা হবে না, এমন সুপারিশ করেছে এনবিআরের গঠিত কর অব্যাহতি পর্যালোচনা কমিটি।
বর্তমানে এসআরও জারির মাধ্যমে এসব ভাতা ও সুবিধার ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য কর ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে নতুন বাজেটে এই সুবিধা বাতিল করা হতে পারে, যদি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদন আসে।
শুধু ভিআইপি ব্যক্তিরাই নয়, বিচারক ও সরকারি চাকরিজীবীরাও বেতন ছাড়া অন্যান্য ভাতা, উৎসব ভাতা, বোনাস ও পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর কর ছাড় পেয়ে থাকেন। নতুন বাজেটে সেই সুবিধাও তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের ওপর বিদ্যমান কর ছাড় সুবিধাও আগামী অর্থবছর থেকে বাতিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান কর ছাড়ের সংস্কৃতি থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসা উচিত। যেসব খাত বা প্রতিষ্ঠান এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা (সানসেট ক্লজ) দিয়ে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো কর দেওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কর নেটের বাইরে রয়েছে—সেই খাতে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতি বছর কর ছাড়ের কারণে বিপুল রাজস্ব হারায় এনবিআর। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের আয়কর আদায়ের সমপরিমাণ। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ফলে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর নতুন অর্থবছরে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চায়।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ট্রাস্ট, ব্যবসায়িক সংগঠন, তেল কোম্পানি, হাসপাতাল, বন্দর, টেলিযোগাযোগ খাত, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদেশি কর্মীদের আয়ের ওপর কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে দাতা সংস্থা, গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ছাড় সুবিধাও পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন, আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপরও কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া পাটজাত পণ্য উৎপাদনে থাকা করমুক্ত সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও আলোচনায় আছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান কর ছাড় পুরোপুরি তুলে না দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে বহাল রাখা এবং বাকিগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কর ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। করদাতারা যেন হয়রানি ছাড়াই সহজে কর দিতে পারেন, সেজন্য অটোমেশন ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক খাতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ১২ শতাংশ কর্পোরেট কর সুবিধা বহাল থাকলেও তা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতির সুবিধা ২০২৯ সালের পর আর না বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআরের কমিটি।