জানা গেছে, গত বছরের ২৪ নভেম্বর উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে নির্ধারিত স্থানে ভবন নির্মাণের জন্য ১৫ দিনের মধ্যে টপোগ্রাফিক সার্ভে, মাস্টারপ্ল্যান ও সয়েল টেস্টসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্নের নির্দেশনা দেওয়া হয়। উপজেলা প্রকৌশলী নির্দেশনা অনুযায়ী টপোগ্রাফিক সার্ভে ও সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেন।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রস্তাবিত ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের লে-আউট, হলরুমের নকশা এবং মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন উপজেলা প্রকৌশলী রইসুল আরেফীন। তিনি জানান, নির্ধারিত স্থানে ভবন নির্মাণ করতে হলে পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার গোডাউন অপসারণ জরুরি।
সভায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম উন্নয়নের স্বার্থে তাঁদের ভবন অপসারণে সম্মতি দেন। একইভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রয়োজন হলে গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শিরিন আক্তার নিজ কার্যালয় অপসারণে আপত্তি জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট অনুমোদনপত্র প্রয়োজন। পরে সভায় সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অপসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট পত্র জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করে ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলীর উদ্যোগে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করে নথিপত্র প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. শফিউল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রকল্পের অর্থায়নে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী নাসরিন পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার গোডাউন অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেন।
তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আওতাধীন ইউসিসিএ’র নামে বরাদ্দকৃত জমিতে স্থাপনা অপসারণের ক্ষমতা উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেই; এজন্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন।
বিআরডিবির মহাপরিচালক ড. সরদার মো. কেরামত আলী জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআরডিবির কোনো স্থাপনা ভাঙতে হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে জমি সংক্রান্ত বিরোধ দ্বিপাক্ষিক সভার মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের দাবি, ১৯৭৮ সালের ১৩ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে ইউসিসিএ’র নামে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও শর্ত ছিল—জমির মালিকানা হস্তান্তর করা যাবে না এবং ভাড়া প্রদান করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী নাসরিন বলেন, “যে শর্তে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা মানা হয়নি। জমিটি এখনো উপজেলা পরিষদের নামেই রেকর্ডভুক্ত।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে আটতলা ভবনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে ছয়তলা পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বিআরডিবির আপত্তির কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি সমাধানে জেলা প্রশাসক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিআরডিবির গোডাউনটি গত কয়েক বছর ধরে মাসিক ২০ হাজার টাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যদিও এর আগে দীর্ঘদিন ভবনটি পরিত্যক্ত ছিল। এ বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা ১৩ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে অচলাবস্থা নিরসনে দিকনির্দেশনা চান। তিনি উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত জমিটি উপজেলা পরিষদের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং বিকল্প কোনো উপযুক্ত জায়গা নেই। নতুন জমি অধিগ্রহণ ব্যয়বহুল এবং প্রকল্পের ডিপিপিতে এ সংক্রান্ত কোনো বরাদ্দও নেই। নতুন ভবন নির্মাণ হলে বিআরডিবিসহ অন্যান্য দপ্তরকে প্রয়োজনীয় কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শিরিন আক্তার বলেন, “নতুন ভবন নির্মাণে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে ইউসিসিএ’র নামে বরাদ্দকৃত জমিতে ভবন নির্মাণ করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে।” তিনি দাবি করেন, পূর্বে অন্য স্থানে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ছিল, যা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, উপজেলার উন্নয়নের স্বার্থে নতুন ভবন নির্মাণ হওয়া উচিত। যে জমিতে সয়েল টেস্টসহ কার্যক্রম হয়েছে, সেটি উপজেলা পরিষদের জমি। ভাড়ার শর্তে ইউসিসিএকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেটির মালিক তারা নয়। নতুন ভবন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকেও অফিস বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রস্তাবিত নতুন ভবনের নির্ধারিত জমিতে বিআরডিবির ভবন ও অফিস রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যদিও জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত যথাযথ তথ্য-প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আশা করা যায়, দ্রুতই সমাধান হবে।
এ বিষয়ে বিআরডিবির মহাপরিচালকের সরকারি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে পরিচালক (সরেজমিন) মো. মনোয়ারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বিভাগের সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারও বাধাগ্রস্ত হবে।







