আজ ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। তারিখটা ফুটবল বিশ্বের জন্য শুধু একটি দিন নয়, বরং একটা আবেগের নাম। একদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ৪১তম জন্মদিন, অন্যদিকে ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবলের শেষ মহাতারকা নেইমার জুনিয়রের ৩৪তম জন্মদিন।
মোগি দাস ক্রুজেসের সেই অন্ধকার গলি থেকে আজকের এই আলোকোজ্জ্বল রাজপ্রাসাদ—নেইমারের জীবনটা যেন কোনো এক দক্ষ লেখকের লেখা টানটান উত্তেজনার উপন্যাস। আজ তার জন্মদিনে সেই রূপকথার পাতাগুলো উল্টে দেখা যাক।
১৯৯২ সালের এক শীতকালীন রাতে ব্রাজিলের এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম হয় নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়রের। বাবা নেইমার সিনিয়র ছিলেন একজন আধা-পেশাদার ফুটবলার, যার স্বপ্ন ছিল বড় কিন্তু পকেট ছিল শূন্য।
গল্পটা শুরু হয় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দিয়ে। মাত্র চার মাস বয়সে এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় নেইমার প্রায় মারা যেতে বসেছিলেন। কিন্তু বিধাতা হয়তো লিখে রেখেছিলেন অন্য কিছু।
সেই অভাবের দিনগুলোতে নেইমারদের ঘরে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকত না। মোমবাতি জ্বালিয়ে ছোট্ট নেইমার সারা ঘর জুড়ে বল নিয়ে খেলতেন। মা নাদিন সান্তোস বলতেন, আমার ছেলেটা ঘুমানোর সময়ও বলটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখত।
মাত্র ১১ বছর বয়সে যখন তিনি সান্তোস এফসিতে যোগ দেন, তখনই সারা ব্রাজিলে শোরগোল পড়ে যায়— পেলে কি তবে ফিরে এলেন?”রোগা-পাতলা গড়ন, চুলে অদ্ভুত সব স্টাইল, আর পায়ে যেন চুম্বক। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে গোল করাটা ছিল তার নেশা।
২০১১ সালে যখন ১৯ বছর বয়সে তিনি সান্তোসকে কোপা লিবার্তাদোরেস জেতালেন, তখন সারা বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল—এই ছেলেটি সাধারণ নয়। ওই বছরই ফ্লামেঙ্গোর বিপক্ষে তার সেই অতিমানবীয় গোলটি তাকে এনে দেয় ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড।
২০১৩ সালে নেইমার যখন ক্যাম্প ন্যু-তে পা রাখলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক নতুন যুগের সাক্ষী হলো। লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ আর নেইমার জুনিয়র—গড়ে তুললেন ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক আক্রমণভাগ।
ঐতিহাসিক ২০১৫, ওই বছর নেইমার বার্সেলোনার হয়ে জেতেন ‘ট্রেবল’ (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা এবং কোপা দেল রে)। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে তার সেই শেষ মুহূর্তের গোলটি ভক্তরা কোনোদিন ভুলবে না।
সেখানে মেসি রাজত্ব করলেও ম্যাচের আসল কারিগর ছিলেন নেইমার। কিন্তু সম্ভবত মেসির ছায়া থেকে বের হয়ে নিজেই ‘সূর্য’ হতে চেয়েছিলেন তিনি। আর তাই ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিশ্ব রেকর্ড গড়ে পাড়ি জমান প্যারিসে।
পিএসজিতে কাটানো সময়টা ছিল নেইমারের জন্য মিশ্র অনুভূতির। সেখানে তিনি ট্রফি জিতেছেন, রাজত্ব করেছেন, কিন্তু ইনজুরি বারবার তার গতি কমিয়ে দিয়েছে। এরপর ২০২৩ সালে আল-হিলালে যোগ দিয়ে সৌদি আরবের ফুটবলে নতুন জোয়ার আনেন।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘পোস্টার বয়’ নেইমার জুনিয়রের জাতীয় দলের ক্যারিয়ারটা যেন এক মহাকাব্য—যেখানে মিশে আছে সোনালী সাফল্য, বুক ফাটানো কান্না আর অবিরাম লড়াইয়ের গল্প।
জাতীয় দলের শুরুটা হয় ২০১০ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যখন তিনি প্রথমবার হলুদ জার্সি গায়ে জড়ালেন, তখনই ফুটবল বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল—পেলে-রোনালদোদের উত্তরাধিকারী চলে এসেছেন। অভিষেকের মাত্র ২৮ মিনিটেই গোল করে তিনি জানান দিয়েছিলেন, ব্রাজিল ফুটবলের নতুন সূর্য উদিত হয়েছে।
২০১৩ সালের কনফেডারেশন কাপ। ফাইনালে প্রতিপক্ষ তখন বিশ্বজয়ী স্পেন। ঘরের মাঠ মারাকানায় নেইমার যেন এক জাদুকর। তার পায়ে বল মানেই গ্যালারিতে গর্জন। স্পেনকে বিধ্বস্ত করে ট্রফি জিতল ব্রাজিল, আর নেইমার জিতলেন গোল্ডেন বল। ফুটবল বিশ্ব দেখল এক নতুন রাজার অভিষেক।
২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলছিলেন, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই ভয়ানক চোট পুরো ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। নেইমার হাসপাতালে, আর ব্রাজিল মাঠের বাইরে।
তবে গল্পের মোড় ঘুরে যায় ২০১৬ সালে। মারাকানায় জার্মানিকে হারিয়ে যখন তিনি ব্রাজিলকে প্রথম অলিম্পিক গোল্ড মেডেল জেতালেন, তখন তার চোখের জল বলে দিচ্ছিল দেশের জন্য এই জয়ের গুরুত্ব কতটা।
এরপর সবশেষে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে নেইমার যখন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য গোলটি করলেন, তিনি স্পর্শ করলেন কিংবদন্তি পেলেকে। বর্তমানে তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। গোলসংখ্যার বিচারে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন পেলে, রোনালদো এবং রোমারিওদের মতো কিংবদন্তিদের।
তবে ৩৪তম জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহার হলো নেইমারের সান্তোসে প্রত্যাবর্তন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি যখন আবারও তার শৈশবের ক্লাবে ফিরে এলেন, তখন সান্তোসের সমুদ্রতীর যেন উৎসবে মেতে উঠেছিল। আজ তিনি ঘরের ছেলে হয়েই ঘরে জন্মদিন পালন করছেন।
নেইমার মানেই ড্রিবলিংয়ের সেই শৈল্পিক প্রদর্শনী। নেইমার মানেই মাঠে ফাউল খেয়ে বারবার পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ানো। ৩৪ বছরে পা দিয়ে নেইমার এখন অনেক বেশি পরিণত। তার সামনে এখন একটাই অপূর্ণ ইচ্ছা— ২০২৬ বিশ্বকাপ!