এই চুক্তির আওতায় চীন মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে অন্তত ২০০টি যাত্রীবাহী বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা ও নৌ-চলাচলের ঝুঁকি এড়াতে চীন এখন বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ দেখিয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, আগামী তিন বছরে চীন প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা করছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কৃষিপণ্য বিক্রির পরিমাণ ‘ডাবল ডিজিট বিলিয়ন’ (১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি) হতে পারে। ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেছেন যে, শি জিনপিং আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নাগাদ ফিরতি সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন। ট্রাম্পের মতে, বাণিজ্যের মতো এই সফরগুলোও এখন থেকে হবে ‘রেসিপ্রোকাল’ বা পারস্পরিক। বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে দুই দেশ একটি ‘বোর্ড অব ট্রেড’ এবং ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ গঠনের পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কৌশলগত পণ্য ও বিনিয়োগ তদারকি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি না হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বেইজিং সফর বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি ও বিমান শিল্পে মার্কিন আধিপত্য আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
জিনপিংয়ের ‘অত্যন্ত সফল’ বৈঠক শেষে বেইজিং ছাড়লেন ট্রাম্প : ট্রাম্প তার চীন সফরকে ‘অত্যন্ত সফল’ হিসেবে অভিহিত করে বেইজিং ত্যাগ করেছেন। সফর শেষে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তার ‘পুরানো বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ট্রাম্প এই সফরকে ফলপ্রসূ মনে করছেন। সফরে উভয় পক্ষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছেছেন এবং বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন। ট্রাম্প বলেন, “শি জিনপিং এবং আমি একটি চমৎকার সম্পর্ক তৈরি করেছি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি নিশ্চিতভাবেই দিন দিন আরও উন্নত হবে।” সফরকালে ট্রাম্প ও শি জিনপিং আঞ্চলিক বিভিন্ন উত্তপ্ত ইস্যু নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি জিনপিংয়ের সাথে এই গভীর যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী এবং অদূর ভবিষ্যতে তাকে ওয়াশিংটনে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছেন।
১২ ঘণ্টার মধ্যে যেভাবে বদলে গেল দুই পরাশক্তির সম্পর্ক : বিশ্বের প্রভাবশালী দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও আলোচনার পর দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অভ্যর্থনা জানান শি জিনপিং। এরপর অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই নেতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা হিসেবে ‘গঠনমূলক এবং কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা একে দুই দেশের বৈরী ভাবাপন্ন সম্পর্কে একটি বড় ধরনের ‘রিসেট’ বা পুনর্গঠন হিসেবে দেখছেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই নতুন সম্পর্কের সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন, এখন থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক পরিচালিত হবে ‘সহযোগিতা’ এবং ‘পরিমিত প্রতিযোগিতার’ ভিত্তিতে, যেখানে সুস্থ স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই নতুন কৌশলগত অবস্থান আগামী তিন বছর এবং তার পরবর্তী সময়ের জন্য দুই দেশের সম্পর্কের পথপ্রদর্শক বা গাইড হিসেবে কাজ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ছাপিয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই সমঝোতা বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ মাসেই চীন সফরে যাচ্ছেন পুতিন ও শেহবাজ শরিফ : বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছে বেইজিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তিন দিনের সফর শেষ হতে না হতেই এবার চীন সফরে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। একই মাসে বিশ্বের তিন প্রভাবশালী নেতার এই সফরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন ভূ-রাজনৈতিক জল্পনা।
হংকং ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০ মে বেইজিং পৌঁছাবেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। একদিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বৈঠক করবেন। তবে ট্রাম্পের সফরের মতো পুতিনের আগমনে কোনো বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজ বা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকছে না বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক পরপরই পুতিনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চীন নিজেকে বিশ্ব রাজনীতির ‘প্রধান মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় মস্কো ও বেইজিং তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে পারে। পুতিনের সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই আগামী ২৩ মে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মে মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সফরের পর এটি হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের দ্বিতীয় সফর। সূত্র : এসসিএমপি, নিউইয়র্ক টাইমস।