আগামী ৩ মার্চ রাতের আকাশে হাজির হতে যাচ্ছে এক মনোমুগ্ধকর মহাজাগতিক দৃশ্য- পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ, যার সময় চাঁদ ধারণ করবে লালচে আভা। এই বিরল দৃশ্য অনেকের কাছেই পরিচিত ‘রেড মুন’ বা ‘ব্লাড মুন’ নামে। আকাশপ্রেমী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য এটি হবে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
কোথায় দেখা যাবে?
এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে অস্ট্রেলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাংশ থেকে। এছাড়াও আমেরিকা মহাদেশ, পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকেও এটি উপভোগ করা যাবে।
বাংলাদেশ থেকেও আংশিক চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের আকাশবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ৩ মার্চ রাত প্রায় ৯টার দিকে গ্রহণ শুরু হয়ে মধ্যরাতের পর ১২টার দিকে শেষ হতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে নগরীর আলোকদূষণমুক্ত স্থান থেকে এটি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
কেন লাল হয় চাঁদ?
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান নেয় এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে। তখন সূর্যের সরাসরি আলো চাঁদে পৌঁছাতে পারে না। তবে চাঁদ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায় না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে ছড়িয়ে দিয়ে তার লাল অংশটুকু চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছাতে দেয়। ফলে চাঁদ ধূসর নয়, বরং লালচে রঙ ধারণ করে। এই কারণেই একে বলা হয় ‘রেড মুন’।
অন্ধকার আকাশ কি জরুরি?
পূর্ণিমার চাঁদ সাধারণত রাতের আকাশকে এতটাই উজ্জ্বল করে যে ক্ষীণ নক্ষত্রগুলো দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু পূর্ণগ্রাস শুরু হলে চাঁদের উজ্জ্বলতা কমে গিয়ে আকাশ অনেকটা অমাবস্যার মতো অন্ধকার হয়ে যায়। তখন উজ্জ্বল নক্ষত্রের পাশাপাশি মিল্কিওয়ে বা নক্ষত্রপুঞ্জও দৃশ্যমান হতে পারে।
যদিও সম্পূর্ণ অন্ধকার আকাশ অপরিহার্য নয়, তবুও আলোকদূষণ কম এমন স্থান থেকে দেখলে অভিজ্ঞতাটি হবে আরও চিত্তাকর্ষক।
দেখার সেরা উপায়
চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই এই দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তবে বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে চাঁদের পৃষ্ঠের রঙের পরিবর্তন, ছায়ার বিস্তার এবং সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
গ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিষ্কার আকাশ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস কয়েক দিন আগে পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যায়। তবে সম্ভাব্য স্থানের গড় মেঘাচ্ছন্নতার তথ্য বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
কেন এই গ্রহণ বিশেষ?
যদিও প্রতি বছর কিছু না কিছু চন্দ্রগ্রহণ ঘটে, সব সময় পূর্ণগ্রাস এবং এত স্পষ্ট লাল আভা দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩ মার্চের এই গ্রহণ হবে দৃষ্টিনন্দন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের রঙ, আলোর তীব্রতা এবং পৃথিবীর ছায়ার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ধারণা পান।
জ্যোতির্বিদদের মতে, এমন পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর কোথাও আবার দেখা যেতে পারে ২০২৮-২০২৯ সালের নববর্ষের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
কুসংস্কার বনাম বিজ্ঞান
প্রাচীনকাল থেকেই রক্তিম চাঁদকে ঘিরে নানা গল্প, পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। অনেক সংস্কৃতিতে একে পরিবর্তন, নতুন সূচনা বা বিশেষ ঘটনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে বিজ্ঞান বলছে, এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পূর্বনির্ধারিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
তবুও, আকাশে লালচে চাঁদের আবির্ভাব মানুষের কল্পনাশক্তিকে নাড়া দেয়- এতে রয়েছে বিস্ময়, সৌন্দর্য এবং মহাবিশ্বের প্রতি নতুন করে মুগ্ধ হওয়ার সুযোগ।