দেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। কাল ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং জুলাইয়ের রক্তস্নাত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া ‘নতুন বাংলাদেশের’ অগ্নিপরীক্ষার দিন। দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের পর আজ দেশের মানুষ ফিরে পেয়েছে তাদের ভোটাধিকার। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাল রচিত হতে যাচ্ছে আগামীর নতুন এক ইতিহাস।
শহরের রাজপথ থেকে গ্রামের মেঠোপথ, সর্বত্রই এখন একটাই আলোচনা—আগামীকালের ভোট। চায়ের কাপে ঝড় উঠছে, মানুষের চোখেমুখে দুলছে আগামীর স্বপ্ন। এবারের ভোট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের নয়, এবারের ভোট জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সীলমোহরে বেঁধে দেওয়ার। ভোটারদের মনে একই সাথে যেমন রয়েছে উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে অনেক না জানা প্রশ্নের ভিড়।
অনেকেই হয়তো জীবনে প্রথমবার ভোট দেবেন, আবার অনেকে দীর্ঘকাল পর নিজের পছন্দের প্রতীকে সিল মারার সুযোগ পাবেন। চাঁদপুরের সেলিনা আক্তারের মতো কোটি কোটি ভোটার আজ রাতে হয়তো ঠিকমতো ঘুমাতেও পারবেন না। তাদের মনে প্রশ্ন—কেমন হবে সেই ভোটকেন্দ্র? কীভাবে দেবেন সেই ঐতিহাসিক গণভোট? এই সব আবেগ, উৎকণ্ঠা আর হাজারো প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
১. ভোটের সময়সূচি ও পদ্ধতি
এবারের নির্বাচনে সময় কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে।
ভোটগ্রহণ শুরু: সকাল ৭:৩০ মিনিট (আগের চেয়ে ৩০ মিনিট এগিয়ে আনা হয়েছে)।
ভোটগ্রহণ শেষ: বিকাল ৪:৩০ মিনিট।
ব্যালট পেপার: সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা-কালো এবং গণভোটের জন্য গোলাপী রঙের ব্যালট দেওয়া হবে।
ভোটের বাক্স: আলাদা বাক্স নয়, সংসদ ও গণভোটের উভয় ব্যালটই একই স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ফেলতে হবে।
২. আপনার ভোটকেন্দ্র ও ভোটার নম্বর জানবেন কীভাবে?
অনেকেই এবার ভোটার স্লিপ হাতে পাননি। তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, আপনি অনলাইনেই সব তথ্য পেয়ে যাবেন-
অ্যাপের মাধ্যমে: গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘Smart Election Management BD 2026’ অ্যাপটি ডাউনলোড করুন। আপনার এনআইডি (১০ বা ১৩ ডিজিট) এবং জন্ম তারিখ দিলে কেন্দ্র ও সিরিয়াল নম্বর দেখা যাবে।
হটলাইন ১০৫: আপনার মোবাইল থেকে ১০৫ নম্বরে কল দিন। অপারেটরের সাথে কথা বলতে ৯ চাপুন এবং আপনার এনআইডি ও জন্ম তারিখ দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করুন।
এসএমএস ও ওয়েবসাইট: নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘ভোট কেন্দ্র’ অপশনে তথ্য দিয়ে আপনি ম্যাপসহ কেন্দ্রের অবস্থান দেখতে পারবেন।
৩. নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ও ভোটার সংখ্যা
দলসমূহ: মোট ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ প্রধান সব দল মাঠে আছে।
নতুন শক্তি: জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র-তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এবার প্রথমবারের মতো ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছে।
অংশগ্রহণ নেই: আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় তারা এই ভোটে নেই। এ ছাড়া জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও বিকল্পধারার মতো দলগুলোও ভোটে অংশ নিচ্ছে না।
ভোটার সংখ্যা: দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ভোটার এবার ভোট দেবেন।
৪. ভোটকেন্দ্রে বিধি-নিষেধ ও সতর্কতা
মোবাইল ফোন: তীব্র সমালোচনার মুখে মোবাইল ফোন বহনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে (গোপন বুথে) মোবাইল নিতে বা ছবি/সেলফি তুলতে পারবেন না।
পর্দা বা নিকাব: পরিচয় নিশ্চিত করতে পোলিং অফিসারকে মুখ দেখাতে হবে। ভোটার তালিকার ছবির সাথে চেহারা মিলিয়ে দেখার পর ভোট দিতে দেওয়া হবে।
শিশু সাথে নেওয়া: যদি সন্তান ছোট হয় এবং প্রতীক না বোঝে, তবে তাকে সাথে নেওয়া যাবে। কিন্তু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের বাইরে রেখে ভোটকক্ষে ঢুকতে হবে।
৫. যানবাহন চলাচল ও নিষেধাজ্ঞা
মোটরসাইকেল: ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত (৭২ ঘণ্টা) বন্ধ।
ভারী যানবাহন: ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্রাক, পিকআপ ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে।
ব্যতিক্রম: জরুরি সেবা (ওষুধ, খাবার, হাসপাতাল), সংবাদপত্রের গাড়ি এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
৬. ফলাফল ও শপথ গ্রহণ
যেহেতু এবার দুটি ব্যালট (সংসদ ও গণভোট) গণনা করতে হবে, তাই ফলাফল পেতে কিছুটা দেরি হতে পারে।
ফলাফল: অনানুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ ফলাফল শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর বা বিকেলের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।
শপথ গ্রহণ: ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে পারেন।
শপথ করাবেন কে: স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি (প্রধান বিচারপতি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন।
২০২৬-এর এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের চেতনা আর কোটি প্রাণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজ আপনার হাতের ব্যালট পেপারটিই হতে যাচ্ছে আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার।
হয়তো ভোটার স্লিপ হাতে পাননি, কিংবা ভোটকেন্দ্র নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় আছেন—কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে সমাধান আপনার হাতের মুঠোয়। সকল ভয় আর জড়তা কাটিয়ে কালকের ভোরে শামিল হোন গণতন্ত্রের উৎসবে। মনে রাখবেন, আপনার দেওয়া প্রতিটি ভোটই হবে শহীদদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।
শান্তি বজায় রেখে কেন্দ্রে যান, নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। জয় হোক সাধারণ মানুষের, জয় হোক নতুন বাংলাদেশের।