সাভারে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুই পোড়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক ভবঘুরে যুবকের আসল পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ। নিজ পরিচয় গোপন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবঘুরে নারীদের পরিত্যক্ত ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে আসত সিরিয়াল কিলার সম্রাট।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আদালতে দেওয়া তার দেওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সাভারে ছয়জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিরিয়াল কিলার সম্রাটের প্রকৃত নাম হচ্ছে সবুজ শেখ। তার বাবার নাম পান্না শেখ। তারা তিন ভাই ও চার বোন। বড় বোন শারমিন। দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তারপর আরেক বোন ও আরেক ভাই। তার পরে আরও দুই বোন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে। সবুজের জন্মস্থান এবং বাবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে। শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে নারীদের সে নির্জন স্থানে নিয়ে আসত। তারা অন্য কারও সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করত। সর্বশেষ ঘটনার তিন-চার দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালায় নিয়ে মেরে ফেলে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে। তারপরে লাশ পুড়িয়ে ফেলে।
গতকাল সোমবার আদালতের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ছয় হত্যা মামলার আসামি সবুজ ওরফে সম্রাট। জবানবন্দি শেষে গত রাতেই তাকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক কামাল হোসেন।
সাভার মডেল থানার আশপাশে প্রায় সময় ঘুরে বেড়ানো সম্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট এবং মশিউর রহমান খান সম্রাট‘ বলে দাবি করছে পুলিশের কাছে। সবশেষ গত রোববার জোড়া হত্যাকাণ্ডে তার নাম বলছে পুলিশ। সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আশপাশ, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রি যাপন করত। রোববার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের পর গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট নিজের যে নাম এবং ব্যাংক কলোনি এলাকায় বাড়ির যে ঠিকানা বলেছে, তার সত্যতা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সম্রাট নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের পুরো নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলছে। এদিকে, পর্যায়ক্রমে ছয়জনকে খুনের যে কারণ সে দাবি করছে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে পুলিশের।
ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অজ্ঞাতনামা পাঁচজনসহ ছয় খুনের দায় স্বীকার করার পর সম্রাটকে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে পাঠানো হয় সোমবার।তিনি বলেন, খুনের কারণ হিসেবে সম্রাট একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। একবার দাবি করছে, ওরা অনৈতিক কাজ করায় তাদের সে মেরে ফেলেছে। আবার দাবি করছে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে নারীদের সে নির্জন স্থানে নিয়ে আসত। তারা অন্য কারও সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করত। সর্বশেষ ঘটনার চার দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালায় নিয়ে মেরে ফেলে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে। তার পরে লাশ পুড়িয়ে ফেল।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, সম্রাটের বক্তব্য কতটা সত্য, তা যাচাই করা হচ্ছে।
ঢাকা জেলার ডিবির (উত্তর) পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম বলেন, এর আগে সম্রাট তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি এবং তার বাবার নাম মৃত সালাম ও মা মৃত রেজেয়া। এসব কিছু যাচাই-বাছাই করে কোনো মিল পায়নি পুলিশ। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরমান আলী বলেন, সম্রাট একজন বিকৃতরুচির মানুষ, সাইকো প্যাথ।
সাত মাসে ৬ খুন
সাত মাস আগে ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধার (৭৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার নাতি মামলা দায়ের করলে পরে আসমা বেগম নামের এই বৃদ্ধার পরিচয় মিলে। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পৌর এলাকার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থানে ১১ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা এক মহিলার (৩০) লাশ পাওয়া যায়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা আরও এক পুরুষ পুরুষের (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এসব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি রোববার পুলিশ দুটি পোড়া লাশ উদ্ধার করে। এর পর সিসিটিভি ফুটেজে একটি লাশ সরাতে দেখা যায় সম্রাটকে। তারপর পুলিশ তাকে আটক করে।
পুলিশ জানায়, আদালতে দেওয়া সিরিয়াল হত্যাকাণ্ডের তথ্য ও পরিচয় নিয়ে পুলিশ তার বক্তব্য যাচাই-বাছাইসহ তদন্তে নেমেছে।
জানা যায়, হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদের ভয়ংকর হিসেবে চিনে। সাভার মডেল থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার ভোররাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে, কারামুক্ত একাধিক হাজতি জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে এই সম্রাট কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বন্দি ছিল। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া। প্রায়ই চুরি করত। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে ছিল বিপদে।