শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন

চাচা-ভাতিজার ধর্ষণকাণ্ড, অন্তঃসত্ত্বা ২ প্রতিবন্ধী বোন

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে দুই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বোন চাচা-ভাতিজার ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার পর মানুষের মুখে মুখে প্রচলন হয়েছে, ‘এই গ্রামে বিয়ে করানোর আগে মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা কি না আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে দেখতে হবে’, যে কারণে ওই গ্রামের অভিবাবকরা নিজেদের বিবাহ উপযুক্ত ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

 

সুত্র জানায়, উপজেলার একটি গ্রামে থাকেন দুই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বোন। দুজনই প্রতিবন্ধী ভাতা পান। দুই বোনের মা-ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বাবা মারা গেছেন আনুমানিক ৪ মাস আগে। খেয়ে না-খেয়ে চলে তাদের সংসার। ২০২২ সালের জুন মাসে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দুই বোনের বড় বোন একই গ্রামের খাইরুল নামে এক যুবকের ধর্ষণে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়। পরে খাইরুল তার সহযোগীদের নিয়ে অপহরণ করে গর্ভপাত করান ওই মেয়েটিকে। তৎকালীন এ ঘটনায় মামলার পর র‍্যাব-১৪ খাইরুলকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশ খাইরুলকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠায়। ওই মামলায় খাইরুল জামিনে আছেন এবং মামলা চলমান আছে।

 

চলতি বছরের ডিসেম্বরে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছোট বোন ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ধরা পড়ে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রতিবন্ধী মেয়ে জানায়, খাইরুলের চাচা হেলিম তাকে ৫ দিন জোরপুর্বক ধর্ষণ করে। এতে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা সালিশ করে মীমাংসার চেষ্টা করেন। তবে হেলিম মিয়া অস্বীকার করায় মীমাংসা হয়নি। পরে ওই প্রতিবন্ধী তরুণীর মা বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

 

ধর্ষণে অন্তসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গত ১৮ ডিসেম্বর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ের মা বাদী হয়ে গৌরীপুর হেলিমকে আসামি করে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে, মামলা হওয়ার ১২ দিন পার হলেও আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

 

আসামি আব্দুল হেলিম মিয়া একই গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফের ছেলে।

 

মামলায় উল্লেখ করা হয়, আসামি আব্দুল হেলিম চলতি বছরের জুলাই মাসের ৫ তারিখে ওই প্রতিবন্ধী মেয়ের মা বাড়িতে না থাকার সুযোগে রান্নাঘরে নিয়ে জোরপুর্বক ধর্ষণ করেন। একই সাথে কাউকে কিছু না বলার হুমকি দেন। এমনকি কাউকে কিছু বললে হত্যার পর মরদেহ গুম করারও হুমকি দেন।

 

পরে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হলে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মায়ের কাছে সবকিছু খুলে বলে। এমতাবস্থায় গত মাসের ২২ তারিখে শম্ভুগঞ্জ বাজারের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ওই মেয়ের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করালে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ধরা পড়ে। পরে আব্দুল হেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে উল্টো মেয়ের পরিবারকে বিভিন্ন হুমকি দেন।

 

এদিকে, বিষয়টি জানাজানি হলে মেয়ের পরিবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে জানায়। পরে স্থানীয়রা গত ১৩ ডিসেম্বর স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে সালিশ করেন। সালিসে মেয়ের পরিবার, আসামি হেলিমের পরিবার, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আহম্মদ আলী, সিরাজুল হক, রজব আলী, সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম শিকদারসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তবে সালিশে আব্দুল হেলিম ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে সালিশে আর কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পরে ওই মেয়ের মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।

 

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আহম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা বিষয়টি মীমাংসার জন্য সালিশ করেছিলাম। তবে হেলিম ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করে। যেহেতু মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেছে। তাই চেয়েছিলাম, বাচ্চার একটি পরিচয় হোক। কিন্তু, তা হয়নি।’

 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা আমাদের বিয়ের উপযুক্ত ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিপাকে আছি। কারণ, আশপাশে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যে কারণে অন্য গ্রামের মানুষজন বলে, আমাদের গ্রামের বিয়ে করানোর আগে মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা না কি তা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে দেখতে হবে, যে কারণে আমাদের মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে। আমরা এর কঠিন বিচার চাই।’

 

স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম শিকদার বলেন, ‘মেয়ের মা আমাদের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়েছিল, যে কারণে, দুই-তিন গ্রামের মানুষ নিয়ে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে সালিশ করেছিলাম। সালিশের উদ্দেশ্য ছিল অনাগত বাচ্চাটার একটা পরিচয় হোক, মেয়েটাও সুখে-শান্তিতে থাকুক। তবে হেলিম ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে আর কোনো সমাধান হয়নি। ঘরোয়াভাবে সালিশ করার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। কারণ মেয়ের মা নিজের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের লোকজনকে জানায়, যে কারণে সালিশে অনেক মানুষ হয়েছিল। কারোর সম্মানহানি সালিশকারীদের উদ্দেশ্য ছিল না।’

 

তিনি আরও বলেন, ওই মেয়ের বড় বোনও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ২০২২ সালে তাকেও ধর্ষণ করেছিল হেলিমের ভাতিজা খাইরুল। পরে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় খাইরুল তার পরিবারের সহযোগিতায় মেয়েকে অপহরণ করে গর্ভপাত করায়। ওই ঘটনায় মামলার আসামিদের আমি নিজে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম।

 

ভুক্তভোগী ছোট বোন বলেন, ‘মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। মা বাড়িতে না থাকার সুযোগে হেলিম আমাকে ৫ দিন রান্না ঘরে নিয়ে জোর করে ধর্ষণ করে। এ ঘটনা কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করে এবং আমাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার হুমকি দেয়, যে কারণে ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলিনি।’

 

ভুক্তভোগী মেয়ের চাচা আব্দুল ওয়াহিদ দয়াল বলেন, ‘মামলা করায় গত ২৩ ডিসেম্বর সকালে হেলিমের চাচাতো ভাই ও খাইরুলের চাচা আসাদুজ্জামান বেধড়ক মারধর করে। মারধরের পর ওই দিন রাতে আসাদুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে গৌরীপুর থানায় অভিযোগ করি। তবে এখনো কোনো আসামি পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি, যে কারণে আসামির লোকজন আমাদের প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি দিয়ে আসছে। আমি চাই আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।’

 

মেয়ের মা বলেন, ‘আমার স্বামী আনুমানিক ৫ মাস আগে মারা গেছে। আমি মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালাই। এই সুযোগ হেলিম আমার মেয়েকে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে। পরে মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। আমি থানায় মামলা করেছি। মামলা করার ১১ দিন পার হলেও পুলিশ আসামি ধরছে না।’

 

আসামি হেলিমের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার স্বামী এমন অপরাধ করতে পারে না। দরবারে জোর করে ওই মেয়েকে আমার স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমার স্বামী যদি অপরাধ করে, তাহলে দেশের আইনে যে শাস্তি হয় তা তার হবে।’

 

গৌরীপুর থানার ওসি মো. কামরুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মামলা কপি বা বাদী-বিবাদীর নাম দেন। আমি বিষয়টি দেখছি।’

 

যেভাবে বড় বোনকে ধর্ষণের পর গর্ভপাত করা হয়

২০২২ সালের ১১ জুন রাতে ভুক্তভোগী তরুণীর মা বাদী হয়ে মো. খাইরুল ইসলাম, তার মা মদিনা আক্তার এবং চাচা আসাদুজ্জামানসহ মোট চার জনকে আসামি করে গৌরীপুর থানায় মামলা করেন। পরে ওই রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে তরুণীকে উদ্ধার করে খাইরুলকে গ্রেপ্তার করে। অন্য অভিযানে র‌্যাব-১৪ খাইরুলের চাচা আসাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে।

 

মামলায় বলা হয়, ভুক্তভোগী তরুণী প্রতিবন্ধী। ২০২২ সালে আনুমানিক সাত থেকে আট মাস আগে খাইরুল তাকে ধর্ষণ করে। তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। এমতাবস্থায় বিষয়টি ধামাচাপা দিতে গত ২০২২ সালের ২৭ মে মধ্যরাতে খাইরুল ও সোহেল বাড়িতে ডুকে ভুক্তভোগীসহ তার মাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। কিন্তু ওই তরুণীকে আটকে রেখে তার মাকে ছেড়ে দেয়। পরদিন বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে তরুণীকে না পেয়ে খাইরুলের মা-বাবাকে বিষয়টি জানালেও কোনো সুরাহা হয়নি। এরপর থেকে খাইরুল ও তরুণী নিখোঁজ ছিল।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102