মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের নতুন যুগের সূচনা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন ও সার্বিক জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হলো টেকসই ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা। আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের প্রথম শর্তই হলো জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিগত কয়েক দশকে বৈশ্বিক রাজনীতির অস্থিতিশীলতা আমাদের স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে যে, তেলের পরনির্ভরতা একটি দেশের মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কতটা মারাত্মক আঘাত হানতে পারে। একটি দেশের অর্থনীতির চাকা যত দ্রুত ঘোরে, তার জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব ততই বাড়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা, কৃষির সেচ, পরিবহন, নৌযান, বিমান, নির্মাণ—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন কেবল একটি খাতকে নয়, পুরো অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথে সংকট, জ্বালানির দামের অস্থিরতা কিংবা সরবরাহ-শৃঙ্খলে আকস্মিক বিপর্যয়—যেকোনো একটি ঘটনা মুহূর্তে একটি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে এখানে একটি শীত সত্য স্বীকার করতেই হবে যে,বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংকটের মূল কারণ কেবল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের নীতিগত দেউলিয়াত্ব ও পরনির্ভরশীলতা। অতীতে পুরো জ্বালানি খাতকে চরমভাবে আমদানিনির্ভর করে রাখা হয়েছিল, যার খেসারত আজ দেশের সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। দেশে বিভিন্ন সময়ে যে তীব্র জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, তার মূল উৎস ছিল দীর্ঘমেয়াদী দূরদর্শিতার অভাব ও লুটপাটমুখী নীতি। তৎকালীন ক্ষমতাশীনরা কখনোই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেনি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজস্ব স্বার্থরক্ষা এবং বিশেষ বলয়ের পকেট ভারী করা। নিজস্ব উৎপাদন ও পরিশোধন ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো টেকসই পদক্ষেপ না নিয়ে, তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির নামে কমিশন বাণিজ্য পরিচালনা করে অলিগার্ক ব্যবসায়ীরা শত শত কোটি ডলার লোপাট করেছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানির যে অসম ও দাসত্বমূলক চুক্তিটি করা হয়েছিল, তার শর্তাবলীর দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায় কেন বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল করে রাখা হয়েছিল। প্রচলিত আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ ও পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে বাধ্য করা হয়েছিল দেশকে, যা বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের জন্য আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার সৃষ্টি করেছে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সরকারের গৃহীত যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আর কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিদ্যুৎ বা জ্বালানির জন্য নির্ভর করার হয়তো প্রয়োজনই পড়বে না।ফ্যাসিস্ট আমলের এই পুঞ্জীভূত সংকট ও পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতেই সম্প্রতি বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবির) সঙ্গে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও আইএসডিবির মধ্যস্থতায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, রেহান আসিফ আসাদসহ দেশি-বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। আইএসডিবির বোর্ড গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে এই অর্থায়ন অনুমোদন করার পর সেপ্টেম্বরে তা চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ভাবমূর্তির প্রতি গভীর আস্থার প্রকাশ।সবচেয়ে বড় কথা হলো, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির যে অর্থহীন নীতি চালু ছিল, তা সম্পূর্ণ ভেঙে দেবে ইস্টার্ন রিফাইনারির এই সম্প্রসারণ প্রকল্প। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক তেল পরিশোধন ক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এই এক বিলিয়ন ডলারের মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা এক লাফে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে গিয়ে পৌঁছাবে, অর্থাৎ পরিশোধন ক্ষমতা সরাসরি তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত উভয় ধরনের তেল মিলে প্রায় ৬৩.৭২ লাখ মেট্রিক টন পেট্রোলিয়াম আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছিল। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হলে দেশের মোট পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ একা এই সম্প্রসারিত শোধনাগার থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিদেশ থেকে চড়া দামে পরিশোধিত তেল না কিনে দেশেই অপরিশোধিত তেল এনে শোধনের মাধ্যমে প্রতি ব্যারেলে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে এবং বাজারে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃত্রিম সংকট রোধ করবে।

একই সঙ্গে এই প্রকল্প পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নের ফলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ‘ইউরো-৫’ পরিবেশবান্ধব পেট্রোলিয়াম জ্বালানি উৎপাদনের পথ সুগম হবে। অতিরিক্ত সালফার ও বিষাক্ত কণার নির্গমন কমিয়ে আনাই ইউরো-৫ মানদণ্ডের মূল লক্ষ্য, যা দেশের বায়ু দূষণের মাত্রা কমিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে। ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির পূর্ণ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক সুশাসন ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার পরিচয় দেয়। ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়কালে এই প্রকল্প দেশের কৃষি, শিল্পায়ন, ভারী উৎপাদন খাত ও পরিবহনে সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে অভূতপূর্ব গতি প্রদান করবে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, যেকোনো মেগা-প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার স্বচ্ছ, দক্ষ ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ওপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে পারলে দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদার সাথে নিজস্ব পরিশোধন ক্ষমতার সঠিক সমন্বয় ঘটবে এবং জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য নিশ্চিত হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হলে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাত গতিশীল থাকে, যা শেষ পর্যন্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করে। পরনির্ভরশীলতা ও দুর্নীতির অধ্যায় পেছনে ফেলে একটি আত্মনির্ভরশীল, সার্বভৌম ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকারের এই মহাপরিকল্পনা পুরো জাতির জন্য এক নতুন আশার আলো ছড়াচ্ছে। সুতরাং বিগত দিনের ভুল নীতি ও বৈদেশিক দাসত্বের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসার এই বাস্তবমুখী প্রচেষ্টা কেবল জ্বালানি খাতের সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে ইনশাল্লাহ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102