শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকের সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, আধুনিক ল্যাব ও পাঠদানের ঘাটতির কারণে গুণগত শিক্ষার সংকট দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ও গাইডবই নির্ভরতা। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের শিক্ষা খাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে তারা। শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বৃদ্ধি ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মতো ডিজিটাল আধুনিকায়ন, কারিকুলাম সংস্কার এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণার মতো একগুচ্ছ নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকার গঠনের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার শিক্ষা খাতকে ডিজিটাল, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখেছে। নির্বাচনি ইশতিহারে আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ৬ মাসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে সরকারের সদিচ্ছা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ভিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিএনপি সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও রূপরেখা গ্রহণ করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ (১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা) করা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে স্নাতক বা অনার্স পর্যন্ত নারী শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক (ফ্রি) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এর সমস্ত খরচ রাষ্ট্র বহন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের সন্তান এবং আহত ছাত্র যোদ্ধাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে। সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক ১৮০ দিনের বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই ঘোষণা দেন।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে ডিজিটাল ও আকর্ষণীয় করতে সরকার ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির রূপরেখা গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও দক্ষ শিক্ষকদের মাঝে ক্যাটাগরিভিত্তিক ট্যাব/প্যাড বিতরণ করা হচ্ছে। এই ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাক্সেস করতে পারবেন এবং দ্রুত উপস্থিতি ও মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবেন।
সরকার দেশের ১০ হাজার ৫৬৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও জনপ্রিয় করতে প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নতুন শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কোডিং এবং ডেটা সায়েন্সের প্রাথমিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক কম্পিউটার দক্ষতা বাড়াতে ল্যাব পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ দূর করতে এবং স্বাস্থ্যবান ও চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাকে মূল্যায়ন কাঠামোর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনকে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।