নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও রজতজয়ন্তী উদযাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ আয়োজন শুরু হয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে রজতজয়ন্তীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ সময় রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বেলুন উড়ানো হয়। পরে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
র্যালি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফার্মে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং কেন্দ্রীয় পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পরে কেক কাটা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আবুল বাসার। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা) অধ্যাপক ড. মো. আশাবুল হক।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ বলেন, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। সে সময় এ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ছিল। তাই তিনি মনে করেছিলেন, এ দেশে একটি বিশেষায়িত কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সালে ‘দি বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। তখন এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ হিসেবে পরিচালিত হতো।
তিনি বলেন, ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখভাল করত কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফলে ত্রিশাসন চলত এই প্রতিষ্ঠানে।
উপাচার্য বলেন, একসময় শিক্ষার্থীরা এটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ কিংবা গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ক্যাম্পাস হিসেবে রাখার দাবিতে আন্দোলন করেন। কিন্তু কোনো পক্ষই তা মেনে নেয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের অ্যালামনাই ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে এটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়। তাদের আন্দোলনের পর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।
তিনি আরও বলেন, ২৫ বছরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র্যাংকিংয়ে অবস্থান করছে। আশা করি, ২০৫০ সালের মধ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অন্যতম একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে উপাচার্য বলেন, আসুন, আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলি।
উল্লেখ্য, অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষিকে আধুনিকায়ন এবং তৎকালীন বাংলার খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার লক্ষ্যে ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিশিক্ষার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ১০ জন মুসলিম ও ১০ জন হিন্দু শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। চার বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করে ওই ২০ শিক্ষার্থী উপমহাদেশের প্রথম কৃষিবিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দেশভাগের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নামও পরিবর্তিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হলে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট রাখা হয়। পরে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বিএআই)। দেশের কৃষিখাতকে এগিয়ে নিতে বিএআই থেকে হাজার হাজার কৃষিবিদ তৈরি হলেও দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়নি। একপর্যায়ে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটকে এর অধিভুক্ত করা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০১ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটের হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ সেপ্টেম্বর সরকারি গ্যাজেট প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে ৬৩ বছরের পুরোনো কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নতুন পরিচয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে।