ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট এবং অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় কার্যত ভেঙে পড়েছে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ।
সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
৫০ শয্যা বিশিষ্ট কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১১ সালে ৩১ শয্যা থেকে উন্নীত করা হয়। উন্নয়নের অংশ হিসেবে এখানে সংযোজন করা হয় অপারেশন থিয়েটার, আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন এবং চক্ষু পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি অটো রিফ্রেক্টর ও স্লিট ল্যাম্প মেশিন।
এসব সংযোজনের ফলে একসময় হাসপাতালটি স্থানীয় জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু বর্তমানে এসব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবার মান মারাত্মকভাবে নিম্নমুখী হয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আল্ট্রাসনোগ্রাফি কক্ষটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। কক্ষটি খুলে দেখা যায়, প্রায় তিন মাস ধরে ব্যবহার না হওয়ায় ধুলোবালিতে ঢেকে গেছে পুরো কক্ষ।
আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনটির ক্যাবল, মনিটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে সহজেই অনুমান করা যায়, কতদিন ধরে এটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে এবং রোগীরা কী ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে হাসপাতালের কমিউনিটি আই সেন্টারেও। সেখানে থাকা অটো রিফ্রেক্টর ও স্লিট ল্যাম্প মেশিন দুটি প্রায় ছয় মাস ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে।
ফলে চক্ষু রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে সাধারণ রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৪৩ জন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন। নার্স থাকার কথা ৩২ জন, কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ১৬ জন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ২০ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। ফলে হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগেই কাজের চাপ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
জনবল সংকটের কারণে রোগীদের যথাযথ সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও মাতৃসেবা বিভাগে এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
এদিকে যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
যেখানে হাসপাতালে মাত্র ১৫০ টাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার কথা, সেখানে বাইরে একই পরীক্ষা করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা বা তারও বেশি। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি একটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চক্ষু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অচল থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি সবকিছুই বাড়ছে।
ভুক্তভোগী রোগী আয়েশা আক্তার বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনটি নষ্ট থাকায় আমাদের বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল।
আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা খরচ করা আমাদের জন্য খুব কষ্টকর। অনেকেই টাকা না থাকায় পরীক্ষা না করেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
হাসপাতালের চক্ষু কমিউনিটি আই সেন্টারের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স রুপালী আক্তার জানান, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে আমাদের দুটি মেশিন নষ্ট থাকায় রোগীদের পরীক্ষার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে। এতে রোগীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি আমি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
এ বিষয়ে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, নার্স সংকটের কারণে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।
বিদ্যমান জনবল দিয়ে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃষ্টি করে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনটি একাধিকবার মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে এটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আর ঠিক করা সম্ভব হয়নি। চক্ষু কমিউনিটি আই সেন্টারের অটো রিফ্রেক্টর ও স্লিট ল্যাম্প মেশিন দুটি মেরামতযোগ্য নয়।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন মেশিনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই নতুন মেশিন পাওয়া যাবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং বিকল যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন না করা হলে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান আরও অবনতি ঘটবে।