জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে আওয়ামী লীগ নেতা এবং জুলাইযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালানো সেই ব্যক্তির সঙ্গে তিনি কীভাবে গোপন বৈঠক করছেন এমন নানা প্রশ্নে তোপের মুখে পড়েন হাসনাত। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে তর্ক-বিতর্ক ও প্রশ্নোত্তর চলে। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতেও দেখা যায়। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রটোকল ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন হাসনাত।
এ বিষয়ে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দিনশেষে রাজনীতিতে আমাদের অনেক মতপার্থক্য থাকবে এটাই রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। একই সঙ্গে মৌলিক রাজনীতির বাইরে গিয়েও আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর যুবদলের সহসভাপতি সাহেদ আকবর, নগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মেজবাহউল নোমান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়েস, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজিবুল হক বাপ্পি, যুগ্ম আহ্বায়ক মহারম আলী, আকবরশাহ থানা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম উদ্দিন, ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রদলের ইমনসহ আরও অনেকে।
তবে এ বিষয়ে জানতে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিকেল ৩টার দিকে গোপনে চট্টগ্রামে এসে হাসনাত আবদুল্লাহ সাবেক মেয়র মঞ্জুরের বাসায় প্রবেশ করেন। তবে শুরুতে বিষয়টি পুরোপুরি গোপন রাখা হয়। খবর পেয়ে মঞ্জুর আলমের বাসার গলিতে শতাধিক ছাত্রদল নেতাকর্মী হাজির হন। গণমাধ্যমকর্মীরাও জড়ো হতে থাকেন বাসার সামনে। তবে ওই সময় চট্টগ্রামের এনসিপি নেতারা হাসনাত আবদুল্লাহর সফর সম্পর্কে গণমাধ্যমকে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বিকেল ৫টার দিকে মঞ্জুর আলমের পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, হাসনাতের সঙ্গে বৈঠকের খবরটি গুজব। স্থানীয় দোকানদাররাও জানান, তারা ওই এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহকে দেখেননি।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে দুটি গাড়ি মঞ্জুর আলমের বাসা থেকে দ্রুত বের হতে দেখা যায়। অনেকেই ধারণা করেন, গাড়িগুলোর একটিতে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাড়ি থেকে চলে গেছেন। এতে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে স্থান ত্যাগ করেন। তবে প্রায় এক ঘণ্টা পর ওই বাড়ি থেকে তাকে বের হতে দেখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ছাত্র-জনতা তাকে ঘিরে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। একজন জুলাইযোদ্ধা হয়ে কেন তিনি ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে অভিযুক্ত সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলমের বাসায় গেলেন এমন প্রশ্নের মুখেও ধৈর্য ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ ঘটনার ভিডিও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
খবর পেয়ে আকবর শাহ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার তোপের মুখ থেকে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে উদ্ধার করে।
বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলম দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং এনসিপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উভয় নেতাই ভবিষ্যতে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সূত্রটির দাবি, দুই নেতার এই সাক্ষাৎ আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা বহন করতে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাওয়া বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে গোপন সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মঞ্জুরুল আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। আগামীর রাজনীতি হবে এমনই সৌহার্দ্যপূর্ণ ও জনমুখী।
এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলমের (জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অর্থ জোগানদাতা হিসেবে অভিযুক্ত) গোপন বৈঠককে কেন্দ্র করে পুরো শহরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় মুদি দোকানদার আবদুর রউল বলেন, সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলম সবসময় অর্থ ব্যবহার করে রাজনীতি করেছেন। তিনি টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিতে চেয়েছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপিতে তাকে পদ দেওয়ার জন্য গোপনে কোনো আর্থিক লেনদেনে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের রাজপথে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ সমন্বয়কদের একজন রিদুয়ান সিদ্দিকী বলেন, গোপনে কোনো কিছুই শুভকর নয়। যেহেতু ফ্যাসিবাদের দোসর ও অর্থ জোগানদাতা হিসেবে অভিযুক্ত মঞ্জুর আলমের বাসায় গোপনে বৈঠক হয়েছে, তাই আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বিতর্কিত ব্যক্তিকে এনসিপিতে পদ দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে তিনি চমক সৃষ্টি করেন। মেয়র হওয়ার পর তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হন। তবে বিএনপির দুঃসময়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং সেখানে সক্রিয় হন। বেশ কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপি থেকে মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেন মঞ্জুর আলম। এ প্রেক্ষাপটে তার সঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহর এই গোপন বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।







