বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

সকল কিছুর আগে গণমাধ্যমের সংস্কার ও পরিবর্তন চাই!

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

রাষ্ট্র সংস্কারের কথা আজ সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে। নির্বাচন, সংবিধান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে: যে গণমাধ্যম এসব সংস্কারের আলোচনা জনগণের সামনে তুলে ধরে, সেই গণমাধ্যম নিজেই কতটা সংস্কারযোগ্য?

বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ এক গভীর সংকটে। এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, কাঠামোগত এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।
পক্ষপাতের রাজনীতি: সংবাদ নাকি অবস্থান?
বর্তমানে দেশের অনেক গণমাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। কোনো ঘটনা ঘটলে আগে নির্ধারিত হয় ব্যাখ্যা, পরে খোঁজা হয় তথ্য। শিরোনাম নিরপেক্ষতার বদলে অনেক সময় হয়ে ওঠে বার্তা-বাহী।
একই ঘটনার দুই ভিন্ন চিত্র—দুই ভিন্ন মাধ্যমে—দুই বিপরীত রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করছে। এতে জনগণ তথ্য নয়, ব্যাখ্যার লড়াই পাচ্ছে। গণমাধ্যম যদি রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হয়ে যায়, তবে তা আর চতুর্থ স্তম্ভ থাকে না; হয়ে ওঠে প্রচারণার মাধ্যম।
করপোরেট স্বার্থ বনাম জনস্বার্থ
গণমাধ্যমের বড় অংশ এখন শিল্পগোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মালিকানাধীন। এতে সংবাদ কক্ষের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বড় বিজ্ঞাপনদাতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কতটা সম্ভব? মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিতর্ক কতটা গুরুত্ব পায়?
যদি জনস্বার্থের চেয়ে করপোরেট স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়, তবে গণমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা আইনি সুরক্ষা ছাড়া টেকসই নয়।
মিডিয়া ট্রায়াল ও জনমত প্রভাবিতকরণ
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা, কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ধারাবাহিক ইতিবাচক বা নেতিবাচক কাভারেজ দেওয়া—এসব আচরণ সমাজে বিভাজন বাড়ায়।
গণমাধ্যমের কাজ তথ্য দেওয়া, বিচার করা নয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ বিশ্লেষণের আড়ালে মতাদর্শিক প্রচারণা চলছে।
ডিজিটাল প্রতিযোগিতা ও দায়িত্বহীনতা
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্লিক-নির্ভর অর্থনীতি সংবাদকে পণ্যে পরিণত করেছে। “ব্রেকিং” হওয়ার প্রতিযোগিতায় যাচাই-বাছাই উপেক্ষিত হচ্ছে। ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। পরে সংশোধন এলেও আস্থার ক্ষতি পূরণ হয় না।
ফেসবুক-নির্ভর সাংবাদিকতা, ইউটিউব-ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার নীতিমালা দুর্বল করে দিচ্ছে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও পেশাগত অনিশ্চয়তা
অনেক সাংবাদিক ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। পেশাগত মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের মানোন্নয়ন কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে।

এখন কী করা জরুরি?

১. স্বাধীন ও সাংবিধানিক ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়া কমিশন গঠন।
২. সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও অর্থায়নের পূর্ণ স্বচ্ছতা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
৩. সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রকাশ ও জনসম্মুখে জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু।
৪. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেক ও রিসার্চ ডেস্ক।
৫. সাংবাদিকদের জন্য আইনি সুরক্ষা ও ন্যায্য বেতন কাঠামো।
৬. সংবাদ ও মতামতের স্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করা।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি প্রশ্ন

আপনারা যদি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চান, তবে প্রথমেই গণমাধ্যমকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নিন। কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ দিয়ে আস্থা তৈরি হয় না; স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা দিয়েই আস্থা ফিরে আসে।

গণমাধ্যম রাষ্ট্রের আয়না—এই কথাটি বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু আয়নাকে যদি রাজনৈতিক রঙে রাঙানো হয়, তবে জাতি তার প্রকৃত চেহারা দেখতে পায় না।
সকল কিছুর আগে তাই গণমাধ্যমের সংস্কার ও পরিবর্তন চাই—
জনআস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য,
গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য,
এবং সত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102