সীমান্তে রক্ত, পানিতে বঞ্চনা ও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ—ভারতের দ্বিচারিতার পূর্ণ হিসাব
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে “বন্ধুত্ব” শব্দটি এখন আর আশ্বাস নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধ এক প্রচারণা। মুখে সহযোগিতা, বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ—এই দ্বৈত নীতিই বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যক্ষ করছে। সীমান্তে রক্তপাত, পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চনা, বাণিজ্যে অসমতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে আধিপত্যের একটি সুস্পষ্ট ছক দৃশ্যমান।
সীমান্তে হত্যা: বন্ধুত্বের সবচেয়ে নগ্ন অস্বীকার
বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলে সীমান্তে গুলি চলে না। অথচ বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। প্রতিবার একই আশ্বাস, একই তদন্তের প্রতিশ্রুতি—কিন্তু কার্যকর জবাবদিহি নেই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় আচরণের প্রতিফলন। বড় রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের দায়িত্ব ছিল মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, অথচ সীমান্তে সে দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ।
পানির রাজনীতি: জীবনরেখা নিয়ে ক্ষমতার খেলা
অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তবু তিস্তা চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, উজানে বাঁধ তৈরি হয়, ভাটিতে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ধ্বংস হয়। বন্ধুত্বের নামে পানি আটকে রাখা সহযোগিতা নয়—এটি কৌশলগত চাপ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে জীবনরেখায় অনিশ্চয়তায় রাখা কোনোভাবেই বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় পড়ে না।
বাণিজ্যে বৈষম্য: লাভ একপাশে, দায় অন্যপাশে
ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা এখন কাঠামোগত। ভারতের পণ্য সহজে ঢোকে, বাংলাদেশের পণ্য অশুল্ক বাধা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায়। ট্রানজিট সুবিধা নেওয়া হয়, কিন্তু ন্যায্য প্রতিদান নিয়ে অনীহা স্পষ্ট। বন্ধুত্ব হলে বাণিজ্য হয় পারস্পরিক লাভে, এখানে তা হয়ে উঠেছে একতরফা সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: সবচেয়ে বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার। কোনো দেশের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে কৌশলগত স্বার্থের অধীন করা বন্ধুত্ব নয়—এটি সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা। “স্থিতিশীলতা”র নামে জনগণের মতামতকে পাশ কাটানোর প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে আরও বিষাক্ত করে তোলে।
বাংলাদেশ বদলেছে, বাস্তবতাও বদলাতে হবে
বাংলাদেশ আজ আর দুর্বল রাষ্ট্র নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক পরিসর ও জনমতের শক্তিতে দেশটি আত্মবিশ্বাসী। তাই বন্ধুত্বের নামে অসম আচরণ, চাপ কিংবা অবহেলা মেনে নেওয়ার যুগ শেষ। সমতা ও পারস্পরিক সম্মান—এটাই এখন সম্পর্কের ন্যূনতম ভিত্তি।
সিদ্ধান্ত ভারতের
ভারতকে এখন পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি সত্যিকারের বন্ধু হতে চায়, নাকি কেবল আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের নীতিতেই অটল থাকবে? ইতিহাস একবার নয়, বারবার প্রমাণ করেছে—ক্ষমতার দম্ভ দিয়ে সম্পর্ক টেকে না, টেকে ন্যায় ও বিশ্বাস দিয়ে।
বন্ধুত্ব যদি পরীক্ষার বিষয় হয়, তবে সেই পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থতার দায় আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।