শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন

মাছ-মুরগি-ডিমের দামে চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মাছ-মুরগি-ডিমের বাড়তি দামে নিত্যদিনের বাজার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষ। এর সঙ্গে সয়াবিন তেল ও চিনির বাড়তি দাম সংসারের খরচ বাড়িয়েছে। তবে, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় সবজির দাম কিছুটা কমেছে। তবু, মাছ-মুরগি-ডিমসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ঘুরে ক্রেতারা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম ও মুরগি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, গত কয়েক মাসের বন্যা, অতিবৃষ্টি ও তীব্র গরমে খামারে অনেক মুরগি মারা গেছে। পরে অনেক খামারি নতুন করে উৎপাদনে না ফেরা এবং লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগি পালন কমে যাওয়ায় ডিম ও মুরগির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

আজ বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত মাসে বিক্রি হয়েছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। এই হিসেবে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২০ থেকে টাকা। সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে আকারভেদে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকায়। এ ছাড়া গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়।

মুরগির পাশাপাশি বাড়তি রয়েছে ডিমের দামও। গত মাসে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। এখন প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। আবার কোনো কোনো খুচরা বাজারে ১৬০ টাকা ডজনও বিক্রি হতে দেখা গেছে। এই হিসেবে প্রতি হালি ডিমের দাম ৫০ টাকা বা তারও বেশি।

বাড়তি তেল চিনি ও মাছের দাম

সরবরাহ ও উৎপাদন কম থাকায় কারণে গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় আকার ও জাতভেদে অধিকাংশ মাছের দাম কেজি প্রতি ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখন বাজারে আকারভেদে চাষের রুই বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। চাষের পাঙাশ আকার অনুযায়ী কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, আকারভেদে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, মাঝারি আকারের কৈ মাছ ২৮০ থেকে ৩২০ টাকর মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

আকারভেদে দেশি শিং ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড় সাইজের পাবদা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, দেশি পাঁচমিশালি ছোট মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মলা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, টেংরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, আকারভেদে রূপচাঁদা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, বোয়াল আকার অনুযায়ী ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টাকা এবং একই সাইজের চট্টগ্রামের ইলিশ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে। ভোজ্যতেলের এই দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। এখন বাজারে প্রতিকেজি খোলা চিনি ১১৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর মোড়কজাত চিনির কেজি ১২০ টাকা। যা গত মাসে বিক্রি হয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়।

বাজারে এখনো পোলাও বা সুগন্ধি চালের দাম ২০০ টাকার আশপাশে। বিক্রেতারা বলছেন, সুগন্ধি চাল রপ্তানির উন্মুক্ত সুযোগ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ সংকট থেকে দাম বাড়তি। এ জন্য তারা রপ্তানি কমানোর দাবি জানায়। গত মঙ্গলবার সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া মুদি বাজারে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল রয়েছে। এখন প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ৫০ টাকা, রসুন (দেশি) ১০০ থেকে ১৪০ টাকা, দেশি আদা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কমেছে সবজির দাম

বাজারে শীতকালীন সবজি আসতে শুরু করায় দাম কমতে শুরু করেছে। বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থাকে ১২০ টাকা, দেশি শসা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। গাজর (দেশি) ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০ টাকা, বরবটি ৮০ থেকে ১০০টাকা, ঢেঁড়স ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, টমেটো মানভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ধুন্দল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, প্রতি পিস জালি কুমড়া ও লাউ আকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় সবজির দাম গত সপ্তাহে ১০-১৫ টাকা বেশি ছিল।

যা বলছেন ক্রেতা বিক্রেতারা

মাছ, মুরগি ও ডিমের বাড়তি দামে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। ফলে কেউ কমিয়ে দিচ্ছেন মাছ-মাংসের পরিমাণ, কেউ ডিমের হিসাব করছেন গুণে, আবার কেউ সংসারের অন্য খরচ কমিয়ে খাবারের বাজার ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন। ক্রেতাদের এই অভিজ্ঞতার বিপরীতে বিক্রেতারা বলছেন, বাড়তি দামে পণ্য কিনে আনায় তাদের বিকল্পও সীমিত।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বাজার করতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক মেহেদী হাসান শাওন বলেন, আমার বেতন মাসের শুরুতেই নির্দিষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বাজারের খরচ নির্দিষ্ট থাকে না। বাসা ভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ অন্যান্য খরচ দেওয়ার পর বাজারের জন্য যে টাকা থাকে, সেটাই এখন কম পড়ে যাচ্ছে। আগে সপ্তাহে মাছ ও মুরগি দুটোই কিনতাম। এখন সপ্তাহের বাজারে যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে। বেতনের একটা বড় অংশ একই জায়গায় থাকলেও বাজারের তালিকা দিন দিন ছোট হচ্ছে।

রাজধানীর রায়েরবাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা সাকিলা আক্তার বলেন, শিক্ষকতা করে যে বেতন পাই, তার একটা অংশ সংসারে দিই। বাজারের হিসাবটা আমি নিজেই করি। আগে মাসের জন্য ডিম, মাছ ও মুরগির একটা নির্দিষ্ট তালিকা থাকত। এখন সেই তালিকা আর আগের মতো রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বাচ্চাদের টিফিন ও পরিবারের পুষ্টিকর খাবার নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। দাম বাড়লে প্রথমে পরিমাণ কমাই, তারপর প্রয়োজন হলে অন্য পণ্য বাদ দিই। এভাবে চলতে থাকলে খাবারের বৈচিত্র্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

একই বাজারে বাজার করতে আসা রিকশাচালক রাশেদ মোল্লা বলেন, আমার মাসিক বেতন নেই, প্রতিদিন যতটুকু কাজ পাই ততটুকুই আয়। কোনো দিন ৮০০ টাকা হয়, কোনো দিন তার চেয়েও কম। এই টাকা থেকে বাসা ভাড়া, রিকশার জমা আর সংসারের খরচ দিতে হয়। বাজারে মাছ-মুরগির দাম শুনলে এখন আগে ভাবি, আজ কিনলে কাল কী দিয়ে চলব। তাই অনেক দিন মাছ-মাংস বাদ দিয়ে শুধু ডাল আর সবজি দিয়ে পরিবারকে খাওয়াতে হয়। দাম বাড়লে আমাদের মতো মানুষের খাবারের তালিকাই সবার আগে ছোট হয়।

কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা দিদারুল ইসলাম বলেন, ক্রেতারা এখন আগের মতো পরিমাণে মুরগি কিনছেন না। আগে এক কেজি নিলে এখন আধা কেজি নিচ্ছেন, অনেকে আবার দাম শুনে চলে যাচ্ছেন। এতে আমাদের বিক্রিও কমেছে। কিন্তু পাইকারি বাজারে যে দামে মুরগি কিনতে হচ্ছে, তার সঙ্গে পরিবহন ও দোকানের খরচ যোগ হয়। তাই ইচ্ছা করলেই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ডিম বিক্রেতা কামাল বেপারি বলেন, ডিমের দাম বাড়ার পর ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি হিসাব করে কিনছেন। আগে অনেকে একসঙ্গে দুই-তিন ডজন নিতেন, এখন এক ডজন নিতেও দামদর করছেন। অনেকেই প্রয়োজনের বাইরে কিনছেন না। ফলে বিক্রির পরিমাণ কমেছে। আমরা যে দামে আড়ত থেকে ডিম কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করেই দাম নির্ধারণ করতে হয়। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102