বিয়েই তো করব, তাই আগে একটু প্রেম করলে সমস্যা কী? পরে তওবা করে নেব।’ বর্তমান সময়ে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন চিন্তা অস্বাভাবিক নয়। কেউ মনে করেন, সম্পর্কের শেষ পরিণতি যদি বিয়ে হয়, তাহলে বিয়ের আগের প্রেমও হয়তো ক্ষমাযোগ্য। আবার কেউ বলেন, ‘তওবা তো আছেই আগে সম্পর্ক করি, পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব।’ কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধারণার মধ্যে রয়েছে একটি মৌলিক ভুল। কারণ তওবা গুনাহ করার অনুমতিপত্র নয়, তওবা হলো গুনাহ থেকে ফিরে আসার নাম।
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক ভালোবাসা ও আবেগকে অস্বীকার করে না। নারী-পুরুষের মধ্যে আকর্ষণ আল্লাহপ্রদত্ত স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ইসলাম এই অনুভূতিকে পাপ বলেনি, বরং তার জন্য বৈধ পথ নির্ধারণ করেছে নিকাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো, আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।’ (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)
অর্থাৎ ভালোবাসা ইসলামের বিরোধী নয়, হারাম পথে ভালোবাসার প্রকাশই সমস্যার বিষয়।
বিয়ের উদ্দেশ্যে কাউকে পছন্দ করা বৈধ। কোনো নারী বা পুরুষ কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করতে পারেন। তার চরিত্র, দ্বীনদারি, শিক্ষা, পরিবার, মানসিকতা ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে জানার প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু ‘পছন্দ করা’ আর ‘প্রেমের সম্পর্ক চালানো’ এক জিনিস নয়।
বিয়ের আগে দীর্ঘদিন গোপনে প্রেমের সম্পর্ক রাখা, নিয়মিত আবেগঘন কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় ফোনালাপ ও বার্তা আদান-প্রদান, একান্তে দেখা করা, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা এমন কোনো আচরণ যা কামনা ও ফিতনার দিকে নিয়ে যায় এসবকে শুধু ‘বিয়ের উদ্দেশ্য’ দিয়ে বৈধ করা যায় না।
কুরআনের নির্দেশ অত্যন্ত পরিষ্কার, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং নিকৃষ্ট পথ।’(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)
লক্ষ করার বিষয় হলো, আল্লাহ শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করেননি, বলেছেন, ‘তার কাছেও যেয়ো না।’ অর্থাৎ যে পথ মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে, সেসব পথ থেকেও দূরে থাকতে হবে।
এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যদি দুজনের উদ্দেশ্যই বিয়ে হয়? উত্তর হলো, ভালো উদ্দেশ্য হারাম পদ্ধতিকে হালাল করে না। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসের অর্থ হলো, কাজের মূল্যায়নে নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর অর্থ কখনোই এমন নয় যে, ভালো উদ্দেশ্য থাকলে হারাম কাজ বৈধ হয়ে যায়। যেমন কেউ হারাম পথে অর্থ উপার্জন করে বললে, ‘আমার উদ্দেশ্য পরিবারকে ভরণপোষণ করা’ তার ভালো উদ্দেশ্য হারাম উপার্জনকে হালাল করে না। একইভাবে ‘বিয়ের উদ্দেশ্য’ প্রেমের অবৈধ পদ্ধতিকে বৈধ করে না।
বরং ইসলামের সৌন্দর্য হলো বিয়ের আগে প্রয়োজনীয় পরিচয় ও যাচাইয়ের সুযোগ রেখেও হারামের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। পাত্র-পাত্রীর মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা হতে পারে, ভবিষ্যৎ সংসার সম্পর্কে আলোচনা হতে পারে, একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যেতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হবে শালীনতা, প্রয়োজন ও শরিয়তের সীমার মধ্যে। পরিবার ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা এই পথকে আরও নিরাপদ করে।
এখন আসা যাক সবচেয়ে আলোচিত কথাটিতে ‘আগে প্রেম করি, পরে তওবা করে নেব।’
এই মানসিকতা ইসলামের তওবার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ তওবার অন্যতম শর্ত হলো গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং পুনরায় সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প। যে ব্যক্তি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে যে, ‘আমি এখন গুনাহ করব, পরে তওবা করব’, সে প্রকৃত তওবার পরিবর্তে গুনাহকে পরিকল্পনার অংশ বানিয়ে ফেলছে।
মানুষ জানে না তার মৃত্যু কখন আসবে। সে জানে না আগামীকাল তার জীবন থাকবে কি না। সে এটাও জানে না, ভবিষ্যতে তার হৃদয়ে তওবার অনুভূতি সৃষ্টি হবে কি না। তাই ভবিষ্যতের তওবার ওপর নির্ভর করে বর্তমানের গুনাহ করা একজন মুমিনের জন্য নিরাপদ পথ নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, কেউ একবার প্রেমে জড়িয়ে পড়লে তার জন্য আর কোনো আশার পথ নেই। বরং ইসলাম এখানেই সবচেয়ে বড় আশার কথা বলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’(সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)
এই আয়াত একজন গুনাহগার মানুষের জন্য গভীর আশার বার্তা। কেউ যদি অতীতে ভুল করে থাকে, সে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু ফিরে আসার অর্থ হলো ভুল স্বীকার করা, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং আর সেই পথে না ফেরার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তওবাকারী ব্যক্তি এমন, যেন সে কোনো গুনাহই করেনি।’ ( ইবনে মাজাহ)
অর্থাৎ আন্তরিক তওবা মানুষের অতীতকে আল্লাহর ক্ষমার আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় একেবারে পরিষ্কার রাখা জরুরি: বিয়ে করলেই আগের প্রেমের সব গুনাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হয়ে যায় না। বিয়ে একটি বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু অতীতে সংঘটিত গুনাহের জন্য তওবা করতে হবে। কেউ যদি হারাম সম্পর্কে ছিল এবং পরে সেই ব্যক্তিকেই বিয়ে করে, তার নিকাহ বৈধ হতে পারে, কিন্তু অতীতের গুনাহের ক্ষমার জন্য তাকে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে।
অর্থাৎ ‘বিয়ে = অতীতের সব গুনাহ মাফ’ এটি সঠিক ধারণা নয়। সঠিক ধারণা হলো ‘সত্যিকারের তওবা = আল্লাহর ক্ষমার আশা, আর নিকাহ = সম্পর্কের বৈধতা।’
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। কেউ যদি বিয়ের আগে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে অনুতপ্ত হয়ে সম্পর্কের হারাম অংশ ছেড়ে দিয়ে বৈধভাবে বিয়ে করেন, তাহলে তাকে সারাজীবন অতীতের ভুল দিয়ে অপমান করা ইসলামের তওবার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দিতে পারেন।(সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০)
অতএব অতীতে ভুল হয়ে গেলে করণীয় হলো অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকা নয়, বরং সেখান থেকে বেরিয়ে আসা। যদি দুজন সত্যিই পরস্পরকে বিয়ে করতে চায় এবং বিয়ের উপযুক্ত হয়, তাহলে সম্পর্ককে আর দীর্ঘায়িত না করে পরিবারকে জানানো, অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা এবং দ্রুত বৈধ নিকাহর ব্যবস্থা করা উচিত। আর যদি এখনই বিয়ে সম্ভব না হয়, তাহলে ‘বিয়ের আশায়’ প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া নয়, বরং আল্লাহর জন্য নিজেকে সংযত রাখা উচিত।