বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ন

মেয়ের বিয়েতে পাত্র বাছাই, ইসলামের মাপকাঠিতে ‘যোগ্য’ পুরুষ কে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিয়ের প্রস্তাব এলে একটি মুসলিম পরিবারে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো ঘোরে, তা প্রায় একই। ছেলে কী করে, কত আয়, বাড়ি-গাড়ি আছে কি না, বংশমর্যাদা কেমন? এসব প্রশ্ন অগ্রহণযোগ্য নয়; সংসার পরিচালনার সামর্থ্য ইসলামেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিসদের আলোচনায় বারবার একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ছেলেটির দীন ও চরিত্র কেমন?

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তির দীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হওয়া যায়, এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে তাকে বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত; অন্যথায় পৃথিবীতে ফেতনা ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে। ইমাম তিরমিজি রহ. এই হাদিস সংকলন করে একে হাসান বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এখানে ‘দীন’ বলতে কেবল বাহ্যিক ইবাদত নয়, বরং আল্লাহভীতি ও সৎকর্মের সামগ্রিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হয়। ইমাম নববি রহ. তার শরহে মুসলিমে উল্লেখ করেছেন, দীনদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পেছনে কারণ হলো, সম্পদ ও বংশ পরিবর্তনশীল, কিন্তু প্রকৃত দীনদারি মানুষকে ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল রাখে জীবনের সব পরিস্থিতিতে।

দীনদারির এই ব্যাখ্যা আমাদের সমাজে প্রায়ই সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। নামাজ পড়া, দাড়ি রাখা কিংবা ধর্মীয় কথা বলাকেই অনেকে দীনদারির একমাত্র প্রমাণ মনে করেন। অথচ ইমাম গাজালি রহ. ইহইয়া উলুমুদ্দিন গ্রন্থে চরিত্র ও লেনদেনের সততাকে ঈমানেরই অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন মানুষ স্ত্রীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, বাবা-মায়ের প্রতি কতটা যত্নশীল, রাগের মুহূর্তে নিজেকে কতটা সংযত রাখতে পারেন এসবই তার দীনদারির প্রকৃত পরিচয়। রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। (তিরমিজি)

ইমাম ইবনে কাসির রহ. এই হাদিসের আলোকে মন্তব্য করেছেন, একজন মানুষের বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় যতই মজবুত হোক, পরিবারে সে যদি নিষ্ঠুর বা অবিচারী হয়, তবে তার ধর্মীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

সম্পদের প্রশ্নে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে না। স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে, তাই উপার্জনক্ষমতা অবশ্যই বিবেচ্য। তবে ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর অনুসারীরা এবং হাম্বলি ফিকহবিদ ইবনে কুদামা রহ. তার আল-মুগনি গ্রন্থে ‘কাফা’আহ’ বা সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন, সম্পদ কাফা’আহর মানদণ্ডে স্থায়ী কোনো শর্ত নয়, কারণ সম্পদ আসে-যায়। বরং দীনদারি ও চরিত্রই এমন এক গুণ, যা মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে। হানাফি মাজহাবে বংশ ও পেশাগত সামঞ্জস্যকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, মালিকি মাজহাবে দীনদারিকেই মূল বিবেচ্য বিষয় ধরা হয়েছে। এই মাজহাবগত পার্থক্যের মধ্যেও একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট শুধু ধনী বা প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলে হলেই সে উপযুক্ত পাত্র হয়ে যায় না।

বংশমর্যাদার প্রশ্নেও কোরআনের নির্দেশনা স্পষ্ট। সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি। তাফসিরে ইবনে কাসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বংশ ও গোত্র পরিচয়ের মাধ্যমে মানুষ শুধু পরস্পরকে চেনে, কিন্তু আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া। এই নীতি বিয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য একজন ছেলে তার পরিবারের সামাজিক অবস্থানের কারণে ভালো স্বামী হয়ে যান না, তার নিজের চরিত্র ও তাকওয়াই তাকে সেই যোগ্যতা এনে দেয়।

চরিত্র যাচাইয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। রাসুলুল্লাহ সা.-কে এক সাহাবি অসিয়ত জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, রাগ কোরো না। (সহিহ বুখারি)

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখতে পারাই প্রকৃত শক্তিশালী মানুষের পরিচয়, শারীরিক শক্তি নয়। এই শিক্ষা পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক স্বাভাবিক সময়ে ভদ্র আচরণকারী মানুষও রাগের মুহূর্তে তার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে ফেলেন। যার মধ্যে অপমান, হুমকি বা সহিংসতার প্রবণতা দেখা যায়, ইমামরা বারবার সতর্ক করেছেন যে এই বৈশিষ্ট্য বিয়ের পর আরও প্রকট হয়ে ওঠে, কমে না।

মেয়ের নিজের মতামতের বিষয়টিও ইসলামী শরিয়তে উপেক্ষণীয় নয়। সহিহ মুসলিমে এসেছে, পূর্বে বিবাহিত নারী নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি অধিকার রাখেন, আর কুমারী নারীর কাছ থেকেও সম্মতি নিতে হবে; তার নীরবতাই সম্মতি হিসেবে গণ্য হয়। আয়েশা রা.-এর বর্ণনায় দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. কুমারী মেয়েকেও তার বিয়ের বিষয়ে পরামর্শ করতে বলেছেন। ইমাম ইবনে হাজার এই বর্ণনার আলোকে লিখেছেন, অভিভাবকের দায়িত্ব হলো উপযুক্ত পাত্র খুঁজে বের করা, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মেয়ের সম্মতি আবশ্যক শর্ত। ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের বিয়ের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যদিও অন্য মাজহাবে অভিভাবকের ভূমিকা কিছুটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়েছে। তবে সব মাজহাবই এ বিষয়ে একমত যে, মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।

এই সামগ্রিক আলোচনা থেকে ইমামদের অভিন্ন উপদেশ উঠে আসে পাত্রের আয়, বাড়ি-গাড়ি কিংবা বংশ যাচাইয়ের পাশাপাশি জানতে হবে সে সত্যবাদী কি না, তার উপার্জন হালাল কি না, সে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না, নারীর মর্যাদা সে বোঝে কি না, সংকটে সে দায়িত্ব নেবে কি না। ইমাম নববি রহ.-এর ভাষায়, দীন ও চরিত্র এমন এক সম্পদ, যা কখনো নিঃশেষ হয় না, বরং জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় তা পরিপক্ব হতে থাকে অথচ ধন-সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনশীল।

তাই ইসলামের শিক্ষা কেবল ‘ধনী ছেলে খোঁজো’ নয়, ‘বড় বংশের ছেলে খোঁজো’ও নয়, এমনকি শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় দেখাও নয়। শিক্ষাটি আরও গভীর এমন একজন মানুষকে খোঁজো, যার দীন প্রকাশ পায় তার চরিত্রে, চরিত্র প্রকাশ পায় তার আচরণে, আর দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায় তার পরিবারের প্রতি ব্যবহারে। কারণ একজন মেয়ের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা কোনো বড় বাড়ি নয় বরং এমন একজন জীবনসঙ্গী, যার কাছে সে নিজের সম্মান, বিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করতে পারে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102