কিছু মানুষ মারা যান, কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। আর অল্প কিছু মানুষ আছেন, যাদের মৃত্যু তাদের জনপ্রিয়তাকেই আরো দীর্ঘ করে। উত্তম কুমার সেই বিরল মানুষদের একজন। ১৯৮০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। এরপর পেরিয়ে গেছে ৪৬ বছর। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে সিনেমা দেখার অভ্যাস, পরিবর্তন হয়েছে দর্শকের রুচি।
সময়ের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীর আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের কেউ অভিনয়ে অসাধারণ, কেউ তারকা হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়, কেউ আবার চরিত্রাভিনয়ে তৈরি করেছেন নতুন দৃষ্টান্ত। তবু একটি প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে—উত্তম কুমারের জায়গায় আর কেউ এলেন না কেন? আজও কেন ‘মহানায়ক’ বললে বাঙালির চোখের সামনে অন্য কোনো মুখ ভেসে ওঠে না? কেন তার মৃত্যুর এত বছর পরও নতুন কাউকে তার সঙ্গে তুলনা করতে গেলেই তুলনাটা অসম্পূর্ণ মনে হয়? সম্ভবত কারণ, উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি সময়ের মুখ, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, বাঙালির প্রেমের ভাষা এবং এক বিশাল সাংস্কৃতিক আবেগের নাম।
আজ ৩ সেপ্টেম্বর উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতার ভবানীপুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। প্রায় ৩০ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে অভিনয় করেছেন প্রায় ২০১টি সিনেমায়। তার বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ৩৫ জন অভিনেত্রী। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার সিনেমা ২৯টি। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩২টি সিনেমায় সুপ্রিয়া দেবীর বিপরীতে অভিনয় করেছেন তিনি।
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। শুরুটা ছিল সংগ্রামের। কিন্তু সেই সংগ্রামই ধীরে ধীরে তৈরি করেছিল এমন এক শিল্পীকে, যিনি শুধু অভিনেতা নন—প্রযোজক, পরিচালক এবং সর্বোপরি বাঙালির ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তবে উত্তম কুমারের গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়। বরং তার গল্পটা আরো আকর্ষণীয়। কারণ এর মধ্যে ছিল প্রতিভার সঙ্গে পরিশ্রম, তারকার সঙ্গে সাধারণ মানুষ, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অনিশ্চয়তা এবং পর্দার স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে বাস্তব জীবনের এক অসম্পূর্ণ মানুষের সহাবস্থান।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের নিয়ে আলোচনা মানে শুধু একজন অভিনেতাকে নিয়ে কথা বলা নয়—একটি সময়, একটি সমাজ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি আবেগকে ফিরে দেখা। উত্তম কুমার তেমনই এক নাম। তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল অভিব্যক্তি। চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের সামান্য নড়াচড়া, মুখের পরিবর্তন, সংলাপ বলার ভঙ্গি—এসব দিয়েই তিনি দর্শকের সঙ্গে এক অদৃশ্য যোগাযোগ তৈরি করতে পারতেন। উত্তম কুমার নিজেই বলতেন—“আমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে এক্সপ্রেশন, আমার রোম্যান্টিসিজম।”
উত্তম কুমারের ঘনিষ্ঠজন অধীর বাগচীর স্মৃতিতে উঠে আসা কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তম নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন, ক্যামেরার সামনে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী। অধীর বাগচীর স্মৃতিতে উত্তম কুমারকে আমরা এমন একজন শিল্পী হিসেবে পাই, যিনি শুধু নিজের অভিনয় নিয়ে ভাবতেন না; অন্যের শিল্প নিয়েও গভীরভাবে ভাবতেন। গান কীভাবে গাইতে হয়, গানে কীভাবে আবেগ ও অভিব্যক্তি আনতে হয়—এসব বিষয়েও তার ছিল গভীর আগ্রহ।
‘বনপলাশীর পদাবলী’-তে অধীর বাগচীকে জোর করে সংগীত পরিচালনায় নিয়ে আসার ঘটনাটিও তার এই শিল্পীসত্তার পরিচয় দেয়। অর্থাৎ তিনি শুধু নিজে ভালো করতে চাইতেন না; প্রতিভা দেখলে অন্যকেও সামনে নিয়ে আসতে চাইতেন। উত্তম কুমারের একটি আত্মবিশ্বাসী উক্তি তার তারকা হয়ে ওঠার রহস্যের অনেকটাই বলে দেয়। অধীর বাগচীর স্মৃতিতে উত্তম বলেছিলেন—“আমি জানি কী করে মহানায়ক হয়েছি। ক্যামেরাটাকে গুলে খেয়েছি।”
বাক্যটি হয়তো রসিকতার মতো শোনায়। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে তার পেশাদারিত্বের গভীর সত্য। মহানায়ক হয়ে ওঠা তার কাছে শুধু ভাগ্যের ব্যাপার ছিল না। বছরের পর বছর ক্যামেরার সামনে কাজ করা, অভিজ্ঞতা দিয়ে অভিনয়কে স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলা, উচ্চারণকে শাণিত করা, চোখ-মুখের অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা—এসব ছিল তার দীর্ঘ সাধনার ফল।
উত্তম কুমারকে বাঙালির রোমান্টিক নায়ক বলা হয়। কিন্তু তার রোমান্টিসিজম শুধু সুদর্শন চেহারা কিংবা প্রেমের সংলাপে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার কণ্ঠ, দৃষ্টি, হাঁটার ভঙ্গি, শরীরি ভাষা, সংলাপ বলার ধরন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ পুরুষ-ইমেজ। তাই উত্তমের প্রেমের দৃশ্য শুধু প্রেমের দৃশ্য ছিল না। সেগুলো হয়ে উঠেছিল বাঙালির কল্পনার প্রেমের ভাষা। তিনি যখন তাকাতেন, দর্শক শুধু একজন অভিনেতার চোখ দেখতেন না; তারা সেখানে নিজেদের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন দেখতে পেতেন। উত্তমের রোমান্টিসিজমের ধারণাটিও বাঁধাধরা ছিল না। অধীর বাগচীর স্মৃতিতে, উত্তম বলেছিলেন—রোমান্টিসিজম অনেকটা স্বপ্নের মতো; কোনো কোনো মানুষকে দেখলে তা আপনা থেকেই তৈরি হয়। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, কথা বলার ধরন, ব্যক্তিত্ব—এসবই তাকে আকৃষ্ট করত।
এই জায়গাটিতেই হয়তো উত্তমের অভিনয়ের বিশেষত্ব। তিনি শুধু প্রেমের অভিনয় করেননি; তিনি প্রেমে পড়ার অনুভূতিটাকেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু তাকে বুঝতে হলে পর্দার বাইরের মানুষটির দিকেও তাকাতে হয়। শুটিংয়ের অবসরে হাতে বই নিয়ে বসে থাকা উত্তম কুমার। আর বইটি—ফ্রানৎস কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’। অধীর বাগচীর স্মৃতিতে উঠে আসা এই দৃশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পর্দার ‘মহানায়ক’-এর আড়ালে ছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষও। পৃথিবীর বিখ্যাত সাহিত্যিকদের বই পড়তেন, ইংরেজি সাহিত্য পড়তেন। অথচ এই মানুষটিই নিজের শিক্ষাজীবন নিয়ে আক্ষেপ করতেন।
অধীর বাগচীর স্মৃতিতে, একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে উত্তম কুমার নিজের অক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছিলেন। পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে ঠিকমতো শিক্ষা নিতে পারেননি—এই আক্ষেপ তাকে কষ্ট দিত। একজন মানুষ, যাকে কোটি কোটি বাঙালি ‘মহানায়ক’ বলে ভালোবাসত, নিজের চোখে নিজের একটি অপূর্ণতা দেখতে পেতেন। এই দ্বন্দ্বই হয়তো তাকে আরো মানবিক করে তুলেছিল।
উত্তম কুমারের সঙ্গে ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ফকির দাস। তার স্মৃতিতে, স্টুডিওর গেট দিয়ে ঢোকার সময় থেকে মেকআপ রুমে পৌঁছানো পর্যন্ত উত্তম কুমার যার সঙ্গেই দেখা হতো, কথা বলতেন, খবর নিতেন। ফকির দাসের ভাষায়, “অত বড় মনের মানুষ খুব কমই হয়। মহানায়কের মনটাও ছিল বিরাট।”
আরেকটি ঘটনা যেন তার তারকা-মানসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। দিঘায় রাতের বেলায় দূর থেকে একটি পরিবার এসেছিল শুধু উত্তম কুমারকে একবার দেখবে বলে। এত রাতে দেখা করতে অনিচ্ছুক উত্তমকে শেষ পর্যন্ত ফকির দাস বাইরে নিয়ে এলেন। পরিবারটি তাকে একবার দেখে শান্তি পেল। ঘটনাটি ছোট। কিন্তু এর মধ্যেই যেন ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারের একটা বড় পরিচয় লুকিয়ে আছে। দর্শক তার কাছে পৌঁছাতে পারেন না। কিন্তু তিনি দর্শকের আবেগকে অবহেলা করতেন না।
অধীর বাগচী তার বাবার মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের কথা উত্তম কুমারকে বলেছিলেন। পরে ‘দুই পুরুষ’-এর একটি মৃত্যুদৃশ্য দেখে তার মনে হয়েছিল, বাবার চলে যাওয়ার সেই মুহূর্তটিই যেন পর্দায় ফিরে এসেছে। একজন অভিনেতার জন্য এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে? বাস্তব জীবনের অনুভূতিকে এত গভীরভাবে আত্মস্থ করা, যাতে তা পর্দায় সত্যি বলে মনে হয়—এটাই ছিল উত্তম কুমারের অভিনয়ের বড় শক্তি।
নতুন মহানায়ক তৈরি হলো না কেন? এখানে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা সরিয়ে রাখা দরকার। উত্তম কুমারের পর বাংলা সিনেমায় ভালো অভিনেতা আসেননি—এ কথা একেবারেই সত্য নয়। এসেছেন। অনেকেই এসেছেন। কেউ অভিনয়ে তাকে ছাপিয়েছেন, কেউ চরিত্রাভিনয়ে নতুন ভাষা তৈরি করেছেন, কেউ তারকা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয় হয়েছেন। কিন্তু ‘উত্তম কুমার’ নামের যে সাংস্কৃতিক ঘটনা, সেটিকে কেউ পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি। কারণ মহানায়ক শুধু ভালো অভিনয় দিয়ে তৈরি হন না। এর জন্য দরকার একটি বিশেষ সময়, একটি বিশেষ সমাজ, একটি ভাষা, একটি দর্শকসমাজ এবং একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের বিরল মিলন।
উত্তম কুমারের সময়ে বাংলা সিনেমা ছিল বাঙালির বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সিনেমা হল ছিল সামাজিক জীবনের অংশ। উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছিল প্রায় একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মতো। তাদের পোশাক, কথা বলার ধরন, প্রেম, বিরহ, অভিমান—সবকিছুই মানুষের ব্যক্তিগত কল্পনার অংশ হয়ে গিয়েছিল।
আজকের পৃথিবী আলাদা। একজন দর্শকের সামনে এখন সিনেমার পাশাপাশি ওটিটি, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কনটেন্ট—বিনোদনের অসংখ্য দরজা খোলা। একজন অভিনেতাকে কেন্দ্র করে পুরো সমাজের কল্পনা তৈরি হওয়ার সুযোগ তাই অনেক কম। সুতরাং আজকের কোনো নায়ক উত্তম কুমারের মতো জনপ্রিয় নন বলেই তিনি কম প্রতিভাবান—এ কথা বলা যাবে না। বরং সত্যিটা হলো, উত্তম কুমার যে ধরনের ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, সেই সামাজিক পরিসরটাই আজ আর নেই।
উত্তম কুমার নিজের সীমাবদ্ধতা জানতেন। শিক্ষা নিয়ে আক্ষেপ ছিল। নিজের উচ্চারণ নিয়ে সচেতন ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিল দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা, হতাশা, ব্যর্থতা, শূন্যতা। পর্দায় তিনি ছিলেন স্বপ্নের পুরুষ। কিন্তু পর্দার বাইরে ছিলেন অপূর্ণতা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষ। আর মানুষ সম্ভবত সেই কারণেই তাকে এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিল। কারণ আমরা তার মধ্যে শুধু আমাদের স্বপ্নকে দেখিনি—আমাদের নিজেদের অপূর্ণতাকেও দেখতে পেয়েছিলাম। তাই উত্তম আজও উত্তম।
উত্তম কুমার মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। কিন্তু ‘উত্তম কুমার’ নামটির মৃত্যু হয়নি। কারণ কিছু শিল্পী তাদের সিনেমার মধ্যে বেঁচে থাকেন। আর কিছু শিল্পী তাদের দর্শকের স্মৃতির মধ্যে এমনভাবে মিশে যান যে, তাদের আলাদা করে স্মরণ করারও প্রয়োজন পড়ে না। উত্তম কুমার তেমনই। তার কণ্ঠ এখনো পরিচিত। তার হাসি এখনো চেনা। তার চোখের সেই দৃষ্টি এখনো চেনা। তার সংলাপ এখনো মানুষের মুখে ফিরে আসে। তার প্রেমের দৃশ্য এখনো বাঙালির কল্পনায় জায়গা করে নেয়।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, নায়ক বদলেছে, দর্শক বদলেছে। কিন্তু উত্তম কুমারকে ঘিরে মানুষের অনুভূতিটা বদলায়নি। কারণ উত্তম কুমার কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অধ্যায়ের নাম নন। তিনি একটি অনুভূতির নাম। আর সেই কারণেই হয়তো তার জায়গায় আর কাউকে বসানো সম্ভব হয়নি। কারণ ‘মহানায়ক’ কোনো পদবি নয়, যা একজনের কাছ থেকে আরেকজনের হাতে তুলে দেওয়া যায়। মহানায়ক তৈরি হয় ইতিহাসের ভেতর, মানুষের ভালোবাসায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। উত্তম কুমার সেই ইতিহাসেরই অনন্য সৃষ্টি। সেই কারণেই মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও উত্তম কুমার—উত্তম।