মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় নীরবে গড়ে উঠেছে জুয়া ও মাদকের বিস্তৃত সাম্রাজ্য। প্রশাসনের চোখের সামনেই দিনের পর দিন প্রকাশ্যে বসছে জুয়ার আসর ও মাদকের হাট। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। এর প্রভাব পড়ছে পুরো জনপদে। বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, মাদকসেবন, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উমেদপুর ইউনিয়নের নূরুল আমিন কলেজের পেছনে বাবুর ভিটা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে বড় ধরনের জুয়ার আসর ও মাদক কারবার। এলাকাবাসীর দাবি, শীর্ষ জুয়াড়ি ও কথিত ইয়াবা কারবারি শওকত ঢালী, কালু ঢালী ও হালান ঢালীর নেতৃত্বে সেখানে প্রতিদিন জমে ওঠে জুয়ার আসর। শুধু জুয়াই নয়, সেখানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন ও কেনাবেচাও চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জুয়াড়িদের আনা-নেওয়ার জন্য গড়ে উঠেছে আলাদা মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। খবির খান ও বারেক নামের দুই মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকা থেকে জুয়াড়িদের বহনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে জুয়াড়িরা সেখানে আসেন। শুধু শিবচর নয়, জাজিরা, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ভাঙ্গা, কালকিনি, নাওডোবা, খাসেরহাটসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও লোকজন এসব জুয়ার আসরে অংশ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অন্তত পাঁচটি স্থানে নিয়মিত বসছে জুয়ার আসর। এর মধ্যে রয়েছে চান্দেরচর কলেজের পেছনে বাবুর ভিটা, চান্দেরচর ইটভাটার পাশে লিওন ঢালীর গরুর খামারের পার্শ্ববর্তী এলাকা, কুতুবপুর সীমান্তে পিলারের নিচে সামু মাদবরের বাড়ির পাশ, মাদবরচর ইউনিয়নের নাসিরের মোড় এলাকা এবং ভদ্রাসন ইউনিয়নের ক্রোকচর এলাকায় জব্বার মেম্বারের বাড়ির সংলগ্ন স্থান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই এলাকায় ভিড় বাড়তে থাকে। বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে অবস্থান নেয়। গভীর রাত পর্যন্ত চলে জুয়ার আসর ও মাদক সেবন। প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। অনেকেই আতঙ্কে মুখ খুলতে চান না।
একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জুয়ার টেবিলে মানুষ শুধু অর্থ হারায় না, হারায় নিজের বিবেক, পরিবারের শান্তি ও ভবিষ্যৎ। আজ যারা জুয়ার সঙ্গে জড়াচ্ছে, আগামী দিনে তারাই বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়বে।’
সচেতন মহলের মতে, যেখানে প্রতিদিন শতাধিক মানুষের সমাগম ঘটে, অসংখ্য মোটরসাইকেলের বহর চলাচল করে এবং রাতভর প্রকাশ্যে জুয়ার আসর বসে, সেখানে প্রশাসন কিছুই জানে না—এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা না গেলে যুবসমাজ আরও বিপথে যাবে এবং পুরো এলাকায় ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন কাদের বলেন, জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। এ ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জুয়ার আসর ও মাদক কারবার বন্ধ করতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় শিবচরের বিস্তীর্ণ জনপদ সামাজিক অবক্ষয়ের গভীর সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।