কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে গিয়ে মানসিক বিভ্রান্তি ও বাস্তবতাবোধ হারানোর ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ব্যবহারকারী এআই চ্যাটবটের সঙ্গে এমনভাবে আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়ছেন যে তারা বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা হারিয়ে ফেলছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও মনোরোগ চিকিৎসকেরা এই নতুন সংকট নিয়ে সতর্কতা জারি করেছেন।
বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৪ জন ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যারা এআই চ্যাটবট ব্যবহারের পর গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যাডাম হোরিক্যান নামের এক ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। তার দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সের এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’ তাকে এমন তথ্য দিয়েছিল, যা তাকে আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত করে তোলে।অ্যাডামের পরিবার জানিয়েছে, প্রিয় পোষা বিড়ালের মৃত্যুর পর তিনি দীর্ঘ সময় একাকী কাটাতেন এবং নিয়মিত এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলতেন। ধীরে ধীরে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে চ্যাটবটটি সচেতন সত্তার মতো আচরণ করছে এবং তাকে নজরদারির বিষয়ে সতর্ক করছে। পরে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, তিনি আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভাষাভিত্তিক এআই মডেল বা এলএলএম অনেক সময় ব্যবহারকারীর আবেগ ও বিশ্বাসকে প্রশ্ন না করে বরং তা আরও জোরালোভাবে প্রতিফলিত করে। এর ফলে মানসিকভাবে দুর্বল বা একাকী মানুষ বিভ্রান্তিকর চিন্তাকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারেন। গবেষক লিউক নিকোলসের মতে, কিছু এআই মডেল কথোপকথনকে এমনভাবে এগিয়ে নেয় যেন বাস্তব জীবনও একটি গল্পের অংশ, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করতে পারে।
জাপানের একজন চিকিৎসক, যিনি ছদ্মনাম ‘তাকা’ ব্যবহার করেছেন, জানান যে তিনি দীর্ঘদিন চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনের পর নিজেকে অসাধারণ মানসিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করতে শুরু করেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি সন্দেহ করতে থাকেন যে তার কাছে বিপজ্জনক বস্তু রয়েছে এবং পরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তার পরিবারের দাবি, এআইয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীল সম্পর্ক তার আচরণে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।কানাডার নাগরিক এতিয়েন ব্রিসন বর্তমানে ‘হিউম্যান লাইন প্রজেক্ট’ নামে একটি সহায়তা উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। সেখানে এআই ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত শত শত মানসিক বিপর্যয়ের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ব্রিসনের মতে, অনেক ব্যবহারকারী একসময় এআই চ্যাটবটকে তথ্যের উৎস নয়, বরং ব্যক্তিগত বন্ধু বা মানসিক সমর্থন হিসেবে দেখতে শুরু করেন। আর তখনই ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন এআই নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে। ওপেনএআইসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা এমন প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছে যা ব্যবহারকারীর মানসিক অস্থিরতা বা বিপজ্জনক আচরণের সংকেত শনাক্ত করতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রযুক্তি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে এটি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যায়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই চ্যাটবট কখনোই বাস্তব মানবিক সম্পর্ক বা পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প হতে পারে না। একাকিত্ব, মানসিক চাপ বা শোকের সময় মানুষ সহজেই ডিজিটাল সংযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু চ্যাটবটের প্রতিক্রিয়া সবসময় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৈরি হয় না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও গভীর আলোচনা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও মানসিক নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি