পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ, এখন শুধু ফল ঘোষণার অপেক্ষা। কিন্তু এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে এক ভিন্ন গল্প সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দাদের, যারা নাগরিকত্বহীনতা থেকে পূর্ণ ভোটাধিকার অর্জনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন রাজনীতির জটিল সমীকরণে জড়িয়ে পড়েছেন।
দুই দশক আগে কোচবিহারের পয়াতুরকুঠি গ্রামে হেঁটে গেলে বোঝার উপায় ছিল না কোথায় ভারত শেষ আর কোথায় বাংলাদেশ শুরু। কাঁটাতারের বেড়া বা নিরাপত্তা নজরদারি ছাড়াই মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পা রাখত। সেই সময়কার বাসিন্দারা ছিলেন কার্যত নাগরিকত্বহীন। বিদ্যুৎ লাইন মাথার উপর দিয়ে গেলেও ঘরে আলো জ্বলত না, স্কুল-কলেজে পড়তে গেলে ভুয়া পরিচয় নিতে হতো, হাসপাতালেও মিলত না সেবা।
এই বাস্তবতা বদলে যায় ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে, যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় হয়। ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। পয়াতুরকুঠি ও মশালডাঙ্গার মতো এলাকাগুলোও পায় নতুন পরিচয় ভারতের অংশ হিসেবে।
এই পরিবর্তনের ফলে ২০১৬ সাল থেকে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার পান এসব এলাকার মানুষ। তবে তারও আগে, বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে অবৈধভাবে ভারতীয় ভোটার কার্ড বানিয়ে ভোট দিয়েছেন এমন স্বীকারোক্তিও মিলেছে বাসিন্দাদের কাছ থেকে।
এই প্রেক্ষাপটে জিহাদ হোসেইন ওবামার জন্ম এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ২০১০ সালে তার মা আসমা বিবি নিজের আসল পরিচয়েই ভারতের হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হন, যা ছিটমহলবাসীদের জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
বর্তমানে এসব এলাকায় উন্নয়নের ছাপ স্পষ্ট পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু সব সমস্যা মেটেনি। জমির দলিল না পাওয়া, প্রতিশ্রুত প্রতিষ্ঠান না হওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব এসব নিয়ে ক্ষোভ রয়ে গেছে।
আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সামাজিক ঐক্যে। একসময় যারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছেন, এখন তারা বিভক্ত রাজনৈতিক পরিচয়ে। কেউ তৃণমূল কংগ্রেস, কেউ বিজেপি, আবার কেউ বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই বিভাজন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহমান আলির কথায়, যদি আগের মতো একসঙ্গে থাকতাম, তাহলে হয়তো দাবিগুলো সহজে আদায় করা যেত। একই সুর শোনা যায় অন্যদের কাছ থেকেও রাজনীতির কারণে ঐক্য ভেঙে গেছে, আর সেই সুযোগে অনেক দাবিই অপূর্ণ রয়ে গেছে। তবে সব সম্পর্ক ভাঙেনি।
মশালডাঙ্গার জয়নাল আবেদিন বলেন, রাজনীতি আলাদা হলেও বন্ধুত্ব টিকে আছে।
নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ছিটমহলের মানুষ আজ ভোটার গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু তাদের সংগ্রামের নতুন অধ্যায় এখন রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে অধিকার আদায়ের লড়াই।