রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে এই মুজতবা খামেনি ?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন মুজতবা খামেনি। তিনি দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর, নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোববার (৮ মার্চ) মুজতবা খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে দেশটির অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে মুজতবার এই ক্ষমতা গ্রহণ ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থী অংশটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি আরও আভাস দিচ্ছে যে, তেহরান সরকার এই মুহূর্তে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনায় আগ্রহী নয়।

যেভাবে বেড়ে ওঠেন মুজতবা:

ইরানের মাশহাদ শহরে ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন মুজতবা খামেনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সমূহের প্রতিবেদনে তাকে খুবই সাদামাটা জীবন যাপনকারী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আলভি স্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি কোম সেমিনারিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বড় বড় আলেমদের কাছে ধর্মীয় বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৯৮৭ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ধর্মীয় পন্ডিত হওয়ার জন্য কোম শহরে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি।

মুজতবা খামেনি কখনও কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা গণভোটের মুখোমুখি হননি। তবুও কয়েক দশক ধরে তিনি পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তিনি অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

মুজতবা খামেনি তার তরুণ বয়সেই আইআরজিসি-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি বাহিনীর ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ যুক্ত থেকে একাধিক অভিযানে অংশ নেন। তার সেই সময়কার অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগে শীর্ষ পদে রয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুজতবাকে তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নাম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তার বাবা আলী খামেনি প্রায় ৮ বছর প্রেসিডেন্ট এবং এরপর ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।মোজতবা খামেনি কখনও উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা করেননি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে পাহলভি রাজতন্ত্রের মতো তার এই ক্ষমতা গ্রহণ কার্যত একটি নতুন ‘রাজবংশ’ তৈরির সমতুল্য হবে বলে বিতর্ক রয়েছে।

তবে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন। তাকে জনসমক্ষে বক্তৃতা বা জুমার খুতবা দিতে দেখা যায়নি। এমনকি অনেক ইরানি কখনও তার কণ্ঠস্বরও শোনেননি, যদিও তিনি যে ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছিলেন, তা সবারই জানা ছিল।

মুজতবার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ :

দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশে ও বিদেশের বিরোধীরা মুজতবা খামেনির নাম বিক্ষোভকারীদের দমনের সঙ্গে যুক্ত করে আসছেন। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’র সময় মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আইআরজিসি-র বাসিজ বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রথম তুলেছিল সংস্কারপন্থী শিবির।

সেই থেকে বাসিজ বাহিনী শাসনবিরোধী প্রতিটি আন্দোলন দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে দুই মাস আগে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে বাসিজ কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল।

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতে সরকারি বাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা ও প্রশাসন এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করে আসছে।

ধর্মীয় যোগ্যতা:

মুজতবা খামেনির ধর্মীয় পদমর্যাদা নিয়েও কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তিনি বর্তমানে একজন ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ (মধ্যম স্তরের ধর্মগুরু), যেখানে সর্বোচ্চ নেতা হতে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদার প্রয়োজন হয়। তবে তার বাবা ১৯৮৯ সালে যখন নেতা নির্বাচিত হন, তখন তিনিও আয়াতুল্লাহ ছিলেন না এবং তার জন্য আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। মুজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরণের আপস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচার :

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা মুজতবা খামেনি বিভিন্ন দেশে বিপুল সম্পদের মালিক বলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে। যদিও তার নামে সরাসরি কোনো লেনদেনের প্রমাণ নেই, তবে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর বিলিয়ন ডলার লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারের ভেতরের একটি অংশের দাবি, ইরানের ৬০ শতাংশ অর্থনীতি মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় খামেনি পরিবারের মাধ্যমে। দেশটির মুস্তাজাফান ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে ইমাম খোমেনি রিলিফ কমিটি ও খাতাম আল আম্বিয়া কন্সট্রাকশন হেডকোয়ার্টার্স সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় খামেনি পরিবারের ইশারায়।

ব্লুমবার্গের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, লন্ডন ও দুবাইয়ে মুজতবা খামেনির বড় ধরণের আবাসন কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগ রয়েছে শিপিং, ব্যাংকিং ও আথিতেয়তা সেবায় (হোটেল, রিসোর্ট)।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102