দীর্ঘায়ু চাইলে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স মেডিসিনের গবেষক মার্ক ম্যাটসন। গত ২৫ বছর ধরে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণা করছেন এই নিউরোসায়েন্টিস্ট। তিনি বলেন, মানুষের শরীর এমনভাবে ‘বিবর্তিত’ হয়েছে যে, আমরা কয়েক দিন পর্যন্ত খাবার ছাড়াই থাকতে সক্ষম।
জাপানি কোষজীববিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমির যুগান্তকারী আবিষ্কারের সঙ্গে ম্যাটসনের বক্তব্য মিলে যায়। ২০১৬ সালে ‘অটোফ্যাজি’ নামের জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কার্যপ্রণালি উদ্ঘাটন করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ওসুমি।
মানবজাতির (হোমো স্যাপিয়েন্স) বিবর্তনের ইতিহাসে রোজাই ছিল স্বাভাবিক অবস্থা। হাজার হাজার বছর ধরে শিকারি-সংগ্রাহক জীবনযাপন আমাদের জীববৈজ্ঞানিক গঠনকে প্রভাবিত করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১০,০০০ সালে কৃষির আবির্ভাবের আগে মানুষ মৌসুমি খাদ্যসংকটের মধ্যে সুযোগমতো খাদ্য সংগ্রহ করত। সফল শিকার বা আহরণের আগে অনেক সময় কয়েক দিন বা সপ্তাহ অনিচ্ছাকৃত অনাহারে থাকতে হতো।
এই ভোজ-অনাহার চক্র শরীরকে ‘মেটাবলিক ফ্লেক্সিবিলিটি’ শিখিয়েছে। পুষ্টির ঘাটতিতে অটোফ্যাজির মতো বেঁচে থাকার প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পুনর্ব্যবহার করে শক্তি জোগাত।
দীর্ঘ গবেষণার পর ওসুমি দেখান, অটোফ্যাজি হলো একটি মৌলিক কোষীয় প্রক্রিয়া, যা ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় অংশ ভেঙে পুনর্ব্যবহার করে। তিনি বেকারের ইস্ট কোষ ব্যবহার করে অটোফ্যাজি সক্রিয়কারী গুরুত্বপূর্ণ জিন শনাক্ত করেন।
তার গবেষণার আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন অটোফ্যাজি ঘটে, কিন্তু অণুস্তরে কীভাবে কাজ করে তা অজানা ছিল। ওসুমি দেখান, কোষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করে, ঝিল্লিতে আবৃত করে এবং ভেঙে পুনর্ব্যবহার করে।
মাত্র ৫০ বছর আগেও স্বল্প আহার, সীমিত স্ক্রিনটাইম এবং সক্রিয় জীবনধারার ফলে মানুষের দেহে স্বাভাবিকভাবেই অটোফ্যাজি ঘটত। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। অবিরাম ইন্টারনেট, স্ট্রিমিংয়ে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং গেমিং, এসব মানুষের জেগে থাকার সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন নাস্তা ও অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, যা স্থূলতা, ইনসুলিন প্রতিরোধজনিত টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং প্রাগৈতিহাসিক ছন্দকে অনুকরণ করে। এটি অটোফ্যাজি সক্রিয় করে কোষীয় ক্ষতি পরিষ্কার করে, প্রদাহ কমায় এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি আধুনিক জীবনধারাজনিত বহু রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
রোজার প্রধান উপকারিতা
ওজন নিয়ন্ত্রণ: ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং খাদ্যগ্রহণের সময়সীমা কমিয়ে শরীরকে সঞ্চিত চর্বি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে। এতে ক্ষতিকর ভিসেরাল ফ্যাট কমতে পারে।
বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি: রক্তে শর্করা ও ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। রক্তচাপ ও ‘খারাপ’ এলডিএল কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে পারে।
প্রদাহ হ্রাস: রোজা শরীরের প্রদাহসূচক উপাদান কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগ ও আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক।
মস্তিষ্কের উপকার: প্রাণী-গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা স্মৃতি ও জ্ঞানের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে এবং আলঝেইমার ও পারকিনসনের মতো রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কোষ মেরামত ও অটোফ্যাজি: রোজা অটোফ্যাজি সক্রিয় করে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ সরিয়ে নতুন কোষ গঠনে সহায়তা করে।
আন্ত্রিক স্বাস্থ্য: অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে এবং পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়।
দীর্ঘায়ু: চাপ-সহনশীলতা বাড়িয়ে বার্ধক্য বিলম্বিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে।
ওসুমির গবেষণায় দেখা যায়, অটোফ্যাজি প্রদাহজনিত ও অকার্যকর কোষ অপসারণের মাধ্যমে সাইটোকাইনের মতো প্রদাহের সম্ভাবনা হ্রাস করে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাজনিত অটোফ্যাজি NF-κB ও IL-6–এর মতো সূচক কমাতে সহায়ক।
কীভাবে রোজা অটোফ্যাজি সক্রিয় করে
পুষ্টি কমে গেলে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন ও অঙ্গাণু ভেঙে শক্তি ও নতুন উপাদান তৈরি করে। এই ‘স্ব-ভক্ষণ’ প্রক্রিয়া কোষকে পুনরুজ্জীবিত করে। ধারাবাহিক অতিভোজন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে। অটোফ্যাজি সেই ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখে।
তবে রমজান মাসে পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি। ব্যক্তিভেদে বিপাকীয় হার ভিন্ন হতে পারে, তাই ধীরে শুরু করা উত্তম। বিশেষ করে ডায়াবেটিসসহ যেকোনো রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।