রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

পুলিশ কর্মকর্তা থেকে যেভাবে মেক্সিকোর মাদকসম্রাট হয়ে উঠলেন এল মাঞ্চো

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মেক্সিকোর সরকার ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াইয়ে লাশের পাহাড় গড়ে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলেন নেমেসিও ওসেগুয়েরা। অপরাধজগতে ‘এল মাঞ্চো’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন।রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে নিহত হয়েছেন মেক্সিকোর এই শীর্ষ মাদকসম্রাট।

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী চক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) প্রধান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর অপরাধজগতের এক বর্ণাঢ্য অথচ বীভৎস অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাদক চক্র সিনালোয়া কার্টেলের সঙ্গে পাল্লা দিতে এল মাঞ্চো গড়ে তুলেছিলেন এক সুবিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে প্রাণঘাতী মাদক ‘ফেন্টানিল’ পাচারের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত ছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এল মাঞ্চোকে ধরিয়ে দিতে দেড় কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করলেও বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি।

৬০ বছর বয়সী এল মাঞ্চো খুব অল্প সময়ের মধ্যে সিজেএনজিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যা তার একসময়ের মিত্র সিনালোয়া কার্টেলকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভান্দা ফেলবাব-ব্রাউন বলেন, ‘সিনালোয়া কার্টেলের শীর্ষ নেতাদের পর এল মাঞ্চোই ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এটি সত্যিই বিস্ময়কর, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মেক্সিকো ও মার্কিন বাহিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন।’

মেক্সিকোর কারাবন্দি এল চাপো গুজমানের পর মাঞ্চো ছিলেন দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদকসম্রাট। তবে এল চাপো আলোচনায় থাকতে পছন্দ করলেও এল মাঞ্চো থাকতেন আড়ালে। তিনি মাদক ছাড়াও চোরাই জ্বালানি ব্যবসা, জোরপূর্বক শ্রম ও মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া বিভিন্ন অডিওবার্তার মাধ্যমে মাঞ্চোর কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব অডিওতে তাকে চরম অশালীন ভাষায় সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দিতে শোনা যেত।

২০১৫ সালে মাঞ্চোকে গ্রেপ্তার করতে সেনাবাহিনী এক অভিযান শুরু করলে তার অনুসারীরা রকেটচালিত গ্রেনেড (আরপিজি) দিয়ে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছিল। ওই অভিযানে এল মাঞ্চো ধরা পড়লেও সেনাবাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এল মাঞ্চোর ভাড়াটে খুনিদের হাতে পড়লে কারও রেহাই মিলত না। মাঝেমধ্যেই শিরশ্ছেদ করে শত্রুদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতেন তিনি। ২০১৫ সালে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে তার নির্দেশে দুই ডজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল।

এমনকি মেক্সিকো সিটির বর্তমান নিরাপত্তা প্রধান ওমর গার্সিয়া হারফুচও একবার মাঞ্চোর প্রাণঘাতী হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। হারফুচ এবারের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯৬৬ সালে মিশোয়াকান রাজ্যের এক দুর্গম ও দরিদ্র গ্রামে এল মাঞ্চোর জন্ম। ছোটবেলায় কৃষিকাজ করতেন তিনি। পরে উন্নত জীবন-জীবিকার সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে তিনি হেরোইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটেন এবং পরে তাকে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়।

মেক্সিকোতে ফিরে মাঞ্চো পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু অপরাধের নেশা তাকে ছাড়েনি। পুলিশের চাকরি ছেড়ে তিনি মিলেনিও কার্টেলে যোগ দেন এবং দুর্ধর্ষ ভাড়াটে খুনি থেকে কার্টেলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। কিন্তু মিলেনিও কার্টেলের দখল নিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজেই সিজেএনজি প্রতিষ্ঠা করেন।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মেক্সিকোর সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন এল মাঞ্চোর সশস্ত্র ক্যাডাররা সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছিল।

এল মাঞ্চোর এই রক্তাক্ত বিদায় মেক্সিকোর মাদক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তার এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী কে হবেন এবং কার্টেলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে প্রশাসন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102