চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক স্পর্শ করল স্তন (ব্রেস্ট) ক্যানসারের পরীক্ষামূলক একটি ভ্যাকসিন (HER2-Targeting Vaccine)। সাধারণত চতুর্থ পর্যায়ের (মেটাস্ট্যাটিক) ক্যানসারকে অবধারিত মৃত্যু হিসেবেই ধরা হয়। তবে সেই মরণব্যাধিকে জয় করে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন একদল নারী।
দীর্ঘ দুই দশক আগে দেওয়া এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি কেবল ক্যানসার সারিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে ‘প্রশিক্ষিত’ করেছে যে তা ২০ বছর পরও ক্যানসার কোষকে চিনে নিয়ে ধ্বংস করতে সক্ষম। বিজ্ঞানের এই অভাবনীয় সাফল্য ক্যানসার জয় করার লড়াইয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ডিউক ইউনিভার্সিটি ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষকরা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে করা এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স ডেইলি’ ও ‘সাইটেক ডেইলি’তে শুক্রবার ( ৩০ জানুয়ারি) এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে।
ডিউক ইউনিভার্সিটি ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষকরা ২০০১ সালের দিকে একদল মুমূর্ষু রোগীর ওপর এই ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেন। সম্প্রতি সেই ট্রায়ালের ২০ বছর পূর্তিতে দেখা গেছে, যে রোগীদের বড়জোর কয়েক বছর বাঁচার কথা ছিল, তারা আজও সম্পূর্ণ ক্যানসারমুক্ত। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স ডেইলি’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভ্যাকসিনটি মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আজীবনের জন্য ক্যানসারের বিরুদ্ধে সজাগ করে দেয়।
গবেষকরা রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে এক বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন, ২০ বছর পার হলেও এই রোগীদের শরীরে ‘CD27’ নামক একটি বিশেষ প্রোটিন মার্কার অত্যন্ত সক্রিয়। এই মার্কারটি ইমিউন সিস্টেমের ‘মেমোরি সেল’ বা স্মৃতি কোষগুলোকে সজাগ রাখে। ফলে শরীরে কোনো নতুন ক্যানসার কোষ জন্ম নেওয়ার চেষ্টা করলেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তা চিনে ফেলে এবং নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়। একে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘লং-টার্ম ইমিউন মেমোরি’।
প্রধান গবেষক এবং ডিউক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক জাকারি হার্টম্যান বলেন, ‘আমরা সাধারণত ক্যানসার চিকিৎসায় স্বল্পমেয়াদী সাফল্যের কথা চিন্তা করি। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি প্রমাণ করেছে যে, শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে যদি একবার সঠিকভাবে ‘প্রশিক্ষণ’ দেওয়া যায়, তবে সে ২০ বছর পরও ক্যানসার কোষকে চিনে নিয়ে ধ্বংস করতে পারে। এটি ক্যানসার চিকিৎসার মোড় ঘুরিয়ে দেবে।’
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ ড. ভিনসেন্ট তুহি জানান, ‘এই আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে হয়তো ক্যানসার হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধের জন্য শিশুদের মতো বড়দেরও টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।’
এদিকে গবেষণার অন্যতম জীবন্ত উদাহরণ ‘লরি লোবার’। ২০ বছর আগে যখন তার মেটাস্ট্যাটিক ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসকরা তাকে খুব কম সময় দিয়েছিলেন। লরি এই পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না এই ট্রায়াল আমাকে বাঁচাবে কি না, কিন্তু আজ ২০ বছর পরও আমি বেঁচে আছি এবং আমি সুস্থ। এটি একটি মিরাকল।’ গবেষকদের মতে, লরির মতো যারা এই ট্রায়ালে ছিলেন, তারা আজ বিশ্বের কোটি কোটি ক্যানসার রোগীর কাছে আশার প্রতীক।
অধ্যাপক জাকারি হার্টম্যান আরও জানান, এই পুরনো ভ্যাকসিনের অসামান্য সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তারা একটি নতুন ও আরও শক্তিশালী সংস্করণ তৈরি করেছেন। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন এই পদ্ধতি ক্যানসার নিরাময়ের হার প্রায় ৯০ শতাংশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এটি এখন আরও বড় পরিসরে মানুষের ওপর ট্রায়ালের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বর্তমানে এটি উন্নত পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি এফডিএ (FDA) অনুমোদন পেয়ে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসতে পারে। তখন এই টিকা শুধু ক্যানসার সারাবে না, বরং ভবিষ্যতে ক্যানসার যাতে ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন গবেষক ও চিকিৎসকরা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং জনসচেতনতার অভাবে অনেকে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসেন। মেটাস্ট্যাটিক বা ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই টিকার সাফল্য বাংলাদেশের মতো দেশে আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি যদি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়, তবে ক্যানসারকে আর মৃত্যুর পরোয়ানা হিসেবে গণ্য করা হবে না।