জমানো টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে গাজীপুর সদর উপজেলার দরগারচালা এলাকায় এক পোশাকশ্রমিক নারীকে (৩৩) চুরির অপবাদ দিয়ে মারধর ও আটকে রেখে রাতভর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জয়দেবপুর থানায় মামলা হয়েছে। মামলার পর জাহানারা বেগম নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রায় ১৫ বছর আগে পারিবারিক অভিমানের কারণে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে গাজীপুরে চলে আসেন ভুক্তভোগী নারী। পরে পোশাক কারখানায় চাকরির সুবাদে দরগারচালা এলাকার হজরত আলীর স্ত্রী জাহানারা বেগমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে জাহানারা তাকে ‘ধর্মের বোন’ হিসেবে গ্রহণ করেন।
ওই সম্পর্কের ওপর আস্থা রেখে চাকরি করে সঞ্চয় করা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা জাহানারার কাছে জমা রাখেন ভুক্তভোগী। সম্প্রতি সেই টাকা ফেরত চাইলে জাহানারা টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে নিজের বাড়িতে ডেকে নেন বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বাড়িতে যাওয়ার পর হঠাৎ তার বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে চার যুবক ওই কক্ষে প্রবেশ করে। তারা তাকে মারধরের পর পালাক্রমে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাতভর তাকে নির্যাতন করা হয় বলেও তার অভিযোগ।
ভুক্তভোগী বলেন, “জাহানারা আমাকে ধর্মের বোন বানিয়েছিলেন। তাকে বিশ্বাস করেই আমার জমানো টাকা তার কাছে রেখেছিলাম। টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে তার বাড়িতে গেলে আমাকে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়। পরে মারধর করে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। সেখানে কয়েকজন যুবক আমাকে মারধর ও ধর্ষণ করে।”
স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তবে পুলিশ পৌঁছানোর পর ঘটনার ধর্ষণের অংশটি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, পুলিশ আসার আগে স্থানীয়রা ওই নারীর বক্তব্য ভিডিও করে রাখেন। পরে পুলিশ তাকে আলাদাভাবে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য চাপ দেয় এবং তার বক্তব্যও ভিডিও করে বলে দাবি করেন তিনি।
ওই স্থানীয় বাসিন্দার আরও দাবি, পরে অভিযুক্ত জাহানারা বেগমের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে ওই নারীকে দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওই নারী মাটিতে বসে কান্নাকাটি শুরু করেন এবং উপস্থিত লোকজনের সামনে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় স্থানীয় একজন পুরো বিষয়টি ভিডিও করেন বলেও তিনি জানান।
এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় পুলিশি বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন সংবাদমাধ্যমকর্মীরা। এক সাংবাদিক বলেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে— এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি ভুক্তভোগীর বক্তব্য নিতে যান। এ সময় পুলিশ তাকে বাধা দেয়। পরে বিষয়টি জয়দেবপুর থানার ওসি আল মামুনকে জানানো হলে তিনি তদন্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিমকে ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে ভুক্তভোগীকে ২ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রেজাউল করিম। তিনি বলেন, একজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ওই নারীর টাকা ও জামাকাপড় নিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে সেগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের বলেন তিনি।
ধর্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী প্রথমে ধর্ষণের কথা বলেননি জানিয়ে এসআই রেজাউল করিম বলেন, তিনি শুধু তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন।
জয়দেবপুর থানার ওসি আল মামুন বলেন, “সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় জাহানারা নামে একজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
এসআই রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং ভুক্তভোগীকে টাকা দিয়ে বিদায় করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা তার জানা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলায় হজরত আলী, তার স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩২), তরিকুল ইসলামের ছেলে সাইদুর (২৮), আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সজিব (২৪), সফিকুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৭) এবং আফাজ উদ্দিনের ছেলে নাঈমের (২৭) নাম এসেছে।
ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তার স্ত্রী ফোন করে বলেন, তার ‘বোন’ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকেছেন। স্ত্রীর কথা অনুযায়ী তিনি ওই বাড়ির উদ্দেশে বের হন। তবে পুরো ঘটনার কথা তিনি জানতে পারেন শনিবার সকালে।