আগামী ২৯ জুন হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মুখোমুখি হবে জাপান ও ব্রাজিল। রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে টপকে শেষ ষোলোতে ওঠাই এখন জাপানের লক্ষ্য। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব মনে করছেন না কোচ হাজিমে মোরিয়াসু কিংবা তার শিষ্যরা।
বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকেই দারুণ ছন্দে রয়েছে জাপান। গত বছরের সেপ্টেম্বরে টোকিওতে এক প্রীতি ম্যাচে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল তারা। সেই জয়ই যেন বদলে দিয়েছে দলের মানসিকতা। এরপর টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে জাপান। এই সময়ে তারা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে ওয়েম্বলিতে, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ড্র করেছে এবং তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে সেই জয় বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো এশীয় দলের এক ম্যাচে চার গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছে।
গ্রুপ পর্বে সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে জাপান। গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকির মতে, অপরাজিত ধারার আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়া তাদের জন্য বড় ইতিবাচক দিক।
তবে ব্রাজিলকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আক্রমণভাগ যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই ভয়ংকর। মোরিয়াসু মনে করেন, গত সেপ্টেম্বরে জাপানের কাছে হারার স্মৃতি ব্রাজিলকে আরও সতর্ক ও অনুপ্রাণিত করবে। তবু তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সেই ম্যাচ প্রমাণ করেছে জাপান আর সহজ প্রতিপক্ষ নয়।
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মোরিয়াসু বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলে ব্রাজিল। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, জয়ের সুযোগ জাপানেরও আছে।
জাপানের এই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি জিকো। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাপানের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এই প্লেমেকার মনে করেন, বর্তমান জাপান বিশ্বের যে কোনো দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তি অর্জন করেছে।
জিকোর ভাষায়, গত কয়েক বছরে ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে জাপান দেখিয়েছে যে তারা আর কেবল সম্ভাবনাময় দল নয়, বরং সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। একসময় চাপের মুহূর্তে ভেঙে পড়া দলটি এখন প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে জানে এবং পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরতে পারে।
বিশ্বকাপে জাপানের অতীতও আশাবাদ জোগাচ্ছে। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে হেরে যায় তারা। চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে চমক দেখালেও শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে ক্রোয়েশিয়ার কাছে বিদায় নিতে হয়। এবার সেই হতাশা কাটিয়ে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ তাদের সামনে।
মোরিয়াসুর কাছে এই ম্যাচ শুধু জাপানের নয়, পুরো এশিয়ার ফুটবলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিশ্বমঞ্চে সাফল্য অর্জন করে অন্য এশীয় দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে চায় জাপান। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালে ওঠাই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে এশিয়ার সেরা সাফল্য। সেই সীমা অতিক্রম করার স্বপ্ন দেখছে জাপান।
এদিকে বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে জার্মান অর্থনীতিবিদ ও গবেষক জোয়াকিম ক্লেমেন্টের ভবিষ্যদ্বাণী। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন সঠিকভাবে অনুমান করার দাবি করা এই গবেষক তার গাণিতিক মডেলে এবার ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের জয় দেখিয়েছেন। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, দ্বিতীয় রাউন্ডেই জাপানের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে সেলেসাওরা।
ক্লেমেন্টের মডেলটি শুধু ফুটবলীয় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে না। মাথাপিছু জিডিপি, জনসংখ্যা, আবহাওয়ার তাপমাত্রাসহ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকও এতে বিবেচনায় নেয়া হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি প্রতিটি দলের সম্ভাবনা নির্ধারণ করেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে তার সব পূর্বাভাস যে শতভাগ নির্ভুল, তা নয়। নকআউট পর্বের চূড়ান্ত সূচি নির্ধারণ হওয়ার পর কিছু হিসাব ইতিমধ্যে বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। তবু ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ নিয়ে তার পূর্বাভাস নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।
এখন দেখার বিষয়, ক্লেমেন্টের গাণিতিক হিসাব সত্যি হয় কি না। নাকি বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের জোরে আবারও এগিয়ে যাবে ব্রাজিল। তবে একটি বিষয়ে সন্দেহ নেই হিউস্টনে দু’দলের লড়াই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।







