অস্ট্রেলিয়ার সিডনির শান্ত উপশহর ক্যাম্পবেলটাউনের রেমন্ড অ্যাভিনিউ এখনো থমথমে। কয়েকদিন আগেও যে বাড়ির সামনে ছিল স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন, সেখানে এখন পুলিশের হলুদ ফিতা, ফরেনসিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা আর ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শোকাহত প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস। বাংলাদেশি এক পরিবারের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘিরে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে প্রতিদিন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সুমন আহামেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্ত্রী ও দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুপুত্রকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থে সংঘটিত এক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের সংবাদ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
গত সোমবার রাত প্রায় আটটার দিকে জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে নিজেই স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার কথা জানান শমন আহামেদ। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে ভেসে ওঠে বিভীষিকাময় দৃশ্য। বিভিন্ন কক্ষে পড়ে ছিল তিনটি নিথর দেহ। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৪৬ বছর বয়সী এক নারী এবং তার ১২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুপুত্র। পুলিশ জানিয়েছে, দুই শিশুই গুরুতর অটিজম ও বিকাশজনিত জটিলতায় ভুগছিল এবং তারা কথা বলতে পারত না।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল ছিল “অত্যন্ত সহিংস”। নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তদন্তে ব্যবহারের জন্য একটি ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে।
সূত্র জানা গেছে, এটি তাৎক্ষণিক ক্ষোভের ঘটনা নয় বলেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বরং দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার চাপ ভয়াবহ এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন সুমন আহামেদ।
নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাইকেল মোরোনি বলেন, অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলের দৃশ্য দেখে মানসিকভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি জানান,পরিবারটিকে ঘিরে এর আগে পুলিশের কাছে কোনো পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ ছিল না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধেও পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে মামলাটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়। অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত হননি এবং জামিনের আবেদনও করেননি। আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জামিন নামঞ্জুর করে আগামী ১৫ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে এ ঘটনার ওর পুরো অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কমিউনিটির অনেকেই বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার মানসিক চাপ অনেক সময় মানুষকে নীরবে ভেঙে দেয়, যা বাইরের কেউ বুঝতেই পারেন না।
সিডনিস্থ স্কিল ওয়েব গ্লোবাল এর ডাইরেক্টর কমিউনিটি ব্যাক্তিত্ব নাসির উদ্দিন বলেন, অস্ট্রেলিয়াজুড়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবারগুলোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কতটা সহজলভ্য? আর নীরবে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর সংকেত সমাজ কতটা বুঝতে পারছে? ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি ঠেকাতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, সামাজিক সংযোগ এবং কমিউনিটি সাপোর্ট আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।