দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারী নতুন জাতীয় পে-স্কেলের অপেক্ষায় আছেন। বিশেষ করে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি এখন কেবল বেতন কাঠামোর বিষয় নয়, বরং জীবনধারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সংকট।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য বেতন কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা পুরোপুরি দূর করতে পারবে না বলে অনেকে মনে করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে অন্তত ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ মূল বেতন বৃদ্ধি ছাড়া বাস্তব সুফল পাওয়া কঠিন।
গত এক দশকে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় নতুন পে-স্কেল না আসায় পুরোনো বেতন কাঠামো দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ধরুন, নতুন ফিক্সেশনে তার বেতন ৬,০০০ টাকা বাড়ল। যদি বাস্তবে কেবল ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হয়, তবে তার হাতে আসবে মাত্র ৩,০০০ টাকা। কিন্তু একই সময়ে বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় এই বাড়তি আয় কার্যত অপ্রতুল হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে সরকারি কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা) বিশেষ প্রণোদনা চালু করা হয়। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ কর্মচারী এই সুবিধা পাচ্ছেন।
নতুন পে-স্কেলে যদি মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয় কিন্তু এই প্রণোদনা বাতিল করা হয়, তবে অনেক কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক লাভ খুব কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আলোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা। মূল বেতন বাড়লে সাধারণত ভাতার পরিমাণও বাড়ে, তবে হার পুনর্নির্ধারণ করা হলে প্রকৃত আয় প্রত্যাশার তুলনায় কমে যেতে পারে। এতে কর্মচারীদের মধ্যে “এক হাতে দিয়ে অন্য হাতে নেওয়া”র মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো বলছে, কেবল আংশিক বেতন বৃদ্ধি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের দাবি, ৫ শতাংশ প্রণোদনাকে আগে মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত করে তারপর নতুন পে-স্কেল নির্ধারণ করা উচিত। না হলে এটি হবে শুধু হিসাবের পরিবর্তন, বাস্তব সুবিধা নয়।
বর্তমান মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই অবস্থায় কেবল ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি কার্যত প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হতে পারে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পে-স্কেল বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য বাজেটের ওপর চাপ কমানো। তবে কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পরই স্পষ্ট হবে- নতুন পে-স্কেল কি সত্যিই কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত করবে, নাকি এটি কেবল সংখ্যার একটি পরিবর্তন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে।