বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সেমিনার হলে বৃহস্পতিবার (০৭ মে) বিকেলে এসব কথা বলেন তিনি। সেমিনারে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. আব্দুর রাজ্জাক সরকার। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ।
গবেষণা প্রবন্ধে ড. আব্দুর রাজ্জাক সরকার তুলে ধরেন, একটি পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করে, যা পরিবারটির মাসিক পুরো ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দেশের ২২ শতাংশ মানুষের মাসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এবং ৬৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যানসারে সর্বনিম্ন ৩ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা খরচ হয়। প্রতি আটজনের তথ্যে বছরে গড় খরচ ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৩৮ টাকা। করোনাকালে ৩৬ জনের গড় হিসাবে খরচ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৭০৯ টাকা। গবেষক ২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপের ওপর ভিত্তি করে এসব ফল তুলে ধরেন।
গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট বাজেটের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের বর্তমান দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় করের অনুপাত এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করাই পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক ইশতেহারকে জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তর করতে একটি উপদেষ্টা কাউন্সিল কাজ করছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন।’
তিনি বলেন, ‘সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি ‘পূর্ণ জীবনচক্র ভিত্তিক’ (ফুল লাইফ সাইকেল) সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরির পরিকল্পনা করছে।’
‘পরিকল্পনায় শিশুর গর্ভকালীন অবস্থা থেকে শুরু করে শেষ যাত্রা পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারী উন্নয়নকে অগ্রগতির মূল সোপান হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার আওতায় নারী শিশুদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং বয়স্কদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা থাকছে। এখানে কেবল ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নয়, বরং ‘লঞ্জিভিটি ডিভিডেন্ড’ বা বয়স্কদের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ধারণাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের ২৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে অন্তত তিনটি বিশেষ ইউনিট নিশ্চিত করার আলোচনা চলছে—কার্ডিয়াক করোনারি ইউনিট (সিসিইউ), কিডনি ডায়ালাইসিস এবং জটিল প্রসূতি সেবা। বিশেষ ইউনিটগুলো চালুর উদ্দেশ্য হলো, স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং জটিল চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে যাতে দূরে যেতে না হয় তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের অপচয় রোধে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং একই সঙ্গে পুষ্টি কর্মসূচিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
সুশাসন ও গবেষণার স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এই ফ্রেমওয়ার্কে কেবল পরিকল্পনা নয়, বরং বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর পাঁচটি মূল স্তম্ভ হলো, প্রোগ্রামিং ফ্রেমওয়ার্ক, ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্ক, মনিটরিং ফ্রেমওয়ার্ক, ওপেন ডাটা গভর্নেন্স এবং দায়বদ্ধতা’ বলেন তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, আইনের শাসন এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া এই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ছাড়া, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গবেষকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে, গবেষণার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রাখা হবে এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না বলেন তিনি।







