হাওর-তার পানিতে ভেসে যাচ্ছে কত কৃষকের স্বপ্ন। এমনই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার মেদীর হাওরের কৃষাণী বিলকিস খাতুন। তিনি বলেন, ‘২২ হাজার টাকা মজুরি দিয়ে ৩ কানি জমির ধান কাটছি। ধান পেয়েছি ২০ মণ। পরিপক্ব হওয়ার আগেই ধান কাটতে হয়েছে। বেপারি দাম দিচ্ছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে কী করব! ঋণের কিস্তি কীভাবে দেব? মরার ছাড়া আর উপায় নাই…।’
জানা যায়, কয়েক মাসের শ্রম, ঋণ আর স্বপ্ন- সবই এখন হাওরের পানিতে তলিয়ে গেছে তার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নিজের ও বর্গা নেওয়া জমিসহ ২২ কানি জমিতে ধান চাষ করেছিলেন বিলকিস। আত্মীয়-স্বজন ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে তিনি চাষাবাদের খরচ চালিয়েছেন। আশা ছিল, ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন, সংসার চালাবেন এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবেন। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সেই স্বপ্ন এখন ভাঙনের মুখে।
বিলকিস জানান, বৃষ্টির আগে কিছু ধান কাটতে পারলেও বাকি ধান পাকতে দেরি হওয়ায় পরে কাটতে হয়েছে। এখনো তার ১০ কানি জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে। হাওরে থৈ থৈ পানি, জমিতে কাদা আর গলাপানি। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১২০০ টাকা দিনমজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছি না। যেগুলো কেটেছি, সেগুলোও ঠিকমতো শুকাতে পারিনি। ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সব শেষ হয়ে গেল।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার মেদীর হাওরে অন্তত ৫০০ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এতে প্রায় দুই হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর হাওর এলাকায়। তবে পানি বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারেননি অনেক কৃষক।
শুধু মাঠেই নয়, সংকট এখন গোলাঘরেও। যেসব কৃষক আগেভাগে ধান কেটেছেন, তারাও বিপাকে পড়েছেন। টানা বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পেরে অনেকের ধান পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, শুরুতে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া গেলেও গত দুই দিনে শ্রমিক সংকট আরও বেড়েছে। ফলে অনেকেই পাকা ধান চোখের সামনে পানিতে ডুবে যেতে দেখছেন, কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানান, হাওরে পানি বাড়ছে। তবে নতুন করে আর কোনো জমি প্লাবিত হয়নি। বৃষ্টিপাত শুরুর আগেই ৬০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছিল, তাই ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাছরিন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।