বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ১১:৩৩ অপরাহ্ন

আপনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত কেন, জানতে চাইলেই মামলার হুমকি

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (প্রজেক্ট) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তানভীর কবির। প্রায় দেড় বছর আগে তানভীরকে বার্লিন থেকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে কাউন্সিলর পদে বদলি করা হয়। কিন্তু বদলি আদেশের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দেননি তানভীর। এমন অবস্থায় ১৩ মে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসে পরিদর্শনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম দপ্তরের সচিব ড. নজরুল ইসলাম। তবে তানভীরের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি রূপালী বাংলাদেশের এই প্রতিবেদককে মামলার হুমকি দেন এবং বলেন, ‘আপনি ভাই যদি সংবাদ প্রচার করেন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অর্থাৎ মামলাও করতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমি বুঝতে পেরেছি আপনি হচ্ছেন জুলকারনাইন সায়ের খানের বাংলাদেশি এজেন্ট। আপনি নিউজ করবেন; মানে করেই দেবেন মনে হচ্ছে। কিছুতেই থামবেন না।’ এ সময় তিনি সতর্ক করে বলেন, আমিও কিন্তু দেখে নেব তাদের যারা আমার পেছনে লেগেছে। তাদের ব্যাপারটা মনে থাকবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় তানভীরকে ২০২১ সালে জার্মানির বার্লিন দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন কূটনীতিক সাধারণত কোনো মিশনে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসেবে বার্লিনে তানভীরের মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে বছরের ২১ নভেম্বর তানভীর কবিরকে বার্লিন থেকে ইসলামাবাদে বদলি করে আদেশ জারি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই আদেশ মেনে সেখানে যোগ দেননি তিনি। উল্টো বার্লিনে থেকে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে ২৪ নভেম্বর পররাষ্ট্র সচিব বরাবর আবেদন করেছিলেন।

এ ছাড়া ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দূতাবাসে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে রাষ্ট্রদূতের হস্তক্ষেপে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। আরও অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসা এক জার্মান নারী কর্মচারীকেও তানভীর চাকরিচ্যুত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন।

সম্প্রতি দূতাবাসের কমার্শিয়াল উইংয়ে কর্মরত একজন জার্মান নারীর সাথে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে তানভীরের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তানভীর ওই জার্মান নারীকে তার ও দূতাবাসের গাড়িচালকের মেলার ভিজিটর টিকিট তৈরি করার পরিবর্তে কেন তাকে ভাউচার কোড দেওয়া হলো, সে জন্য মেলার দর্শনার্থীদের সামনে অপমান করেন। মেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে এ রূপ আচরণ ব্যাপকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।

ভুক্তভোগী নারী রাষ্ট্রদূতের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও রাষ্ট্রদূত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ওই নারী বাংলাদেশে ন্যাশনাল বুক সেন্টার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। রাষ্ট্রদূত বরাবর ওই নারীর দায়ের করা অভিযোগের কপি রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে। মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো উত্তর না পেয়ে ওই নারী পুরো বিষয়টি জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসে জানান। ফেডারেল ফরেন অফিস ওই নারীর সাথে একাধিকবার এ বিষয়ে যোগাযোগ করে। ন্যাশনাল বুক সেন্টারের তৎকালীন পরিচালক আফসানা বেগমও এ ব্যাপারে তানভীরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদূতের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস পরিদর্শনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম দপ্তরের সচিব ড. নজরুল ইসলাম। আগামী ১৩ মে বার্লিনের উদ্দেশে তার ঢাকা ত্যাগের কথা রয়েছে। এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য তানভীর কবিরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত কিনা এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি আইজিও (ইন্সপেক্টর জেনারেল অপারেশন্স)। আমার কাজ হচ্ছে মিশন ইন্সপেকশন করা। আমি মিশন ইন্সপেকশনে যাচ্ছি। ওই বিষয়টি (তানভীর) মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ‘কনফিডেনশিয়াল’। ওই বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আছে এবং মন্ত্রণালয়ের যা করার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সেটি করবে। আমার সফরের সাথে এটার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই’।

রীতিমতো অনিয়ম ও অপকর্ম

সূত্র মতে, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তানভীর কবিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরও তিনি তার অনিয়ম ও অপকর্ম থেকে বিরত হননি; বরং আগের তুলনায় আরও বেপরোয়া আচরণ শুরু করেছেন। সাংবাদিককে তথ্য সরবরাহের মিথ্যা অভিযোগ এনে এক স্থানীয় জার্মান কর্মচারীকে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই চাকরিচ্যুতির নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে যে, দূতাবাস তার কাজে সন্তুষ্ট নয়, যদিও অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উক্ত কর্মচারী গত বছর ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে পুনরায় কাজে যোগদান করেন। জার্মান আইন অনুযায়ী তাকে পাঁচ বছরের ‘প্রোটেকশন কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে, যার অর্থ এই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করতে পারে না।

স্থানীয় শ্রম আইন অনুযায়ী, বিশেষ অনিবার্য পরিস্থিতিতে ক্যানসার সারভাইভার এবং ‘প্রোটেকশন কার্ড-ধারী’ কোনো কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতে হলে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৮০ শতাংশ অন্যান্য কর্মচারীকে ছাঁটাই করতে হয়। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ আর্থিক সংকটে না পড়লে শুধুমাত্র তাকে বরখাস্ত করা আইনগতভাবে অত্যন্ত কঠিন।

এ অবস্থায়, এই কর্মচারী যদি আদালতের শরণাপন্ন হন, তাহলে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, যা কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, তিনি যদি ফেডারেল ফরেন অফিসের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন, তাহলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি দূতাবাসে রুজমিলা নামের এক বাংলাদেশি নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি পূর্বেও এই দূতাবাসে ১৫ বছরের অধিক সময় কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নান-এর বিরুদ্ধে জার্মান পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি আরও কয়েক বছর দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। জানা যায়, সাবেক তিনজন রাষ্ট্রদূত তাকে চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা করলেও স্থানীয় শ্রম আইনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার সময়ে দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে তিনি চাকরি ত্যাগ করেন।  পুনঃনিয়োগের পর তিনি অ্যাম্বাসেডরের সোশ্যাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যদিও দূতাবাসের প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী, সোশ্যাল সেক্রেটারির মতো দায়িত্ব সাধারণত স্থানীয় নেটিভ নাগরিকদের দেওয়া হয়। বাংলাদেশি কোনো কর্মীকে এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার নজির নেই। মিশনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ নিয়োগের স্বাভাবিক প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি। কোনো পত্রিকা, দূতাবাসের ওয়েবসাইট কিংবা জার্মান চাকরির ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ারও ব্যত্যয় এবং স্বজনপ্রীতিমূলক নিয়োগের অভিযোগকে আরও জোরালো করে তোলে।

সম্প্রতি একজন ইন্টার্নকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নিয়োগে স্বাভাবিক প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি এবং এ ধরনের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্বচ্ছতা ও প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার রীতি রয়েছে, সেটিও মানা হয়নি। কোনো পত্রিকা, দূতাবাসের ওয়েবসাইট কিংবা জার্মান চাকরির ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া আরও অভিযোগ রয়েছে যে, একজন স্বল্পমেয়াদি ইন্টার্ন হিসেবে তার কাছে জন্মনিবন্ধনের জাতীয় সার্ভারের অ্যাক্সেস প্রদান করা হয়েছে, যা সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এ অবস্থায় অভিযোগ উঠেছে যে, তানভীর কবির জাতীয় সার্ভারের তথ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোড অব কন্ডাক্ট যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি, ফলে ডেটা সিকিউরিটি ও প্রটোকল লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এসেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (প্রজেক্ট) তানভীর কবির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আপনি যদি সংবাদ প্রচার করেন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অর্থাৎ মামলা করতেও দ্বিধাবোধ করব না। আপনার প্রশ্ন বলেন? আমি উত্তর দেব, চাইলে লিখে দেব’।  প্রশ্ন তো পাঠিয়েছি ভাই তাহলে উত্তর জানতে চাই প্লিজ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখন মিটিংয়ে রয়েছি’।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102