হামরা কামাই না করলে ঋণ আরও বাড়বে। ওমার (স্বামীর) কামাইয়ে কোনোভাবে খাওয়া চলে, আর নিজের কামাইয়ে ঋণের কিস্তি দেই। হামরা যদি মাইনসের (মানুষের) কাম না করি তাহলে কিস্তি দিবে কায়?’
ঘর ছাড়ার আগে এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন লালমনিরহাটের কাকিনা চাপারতল এলাকার পঞ্চাশোর্ধ নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম। কৃষি ফসলে নারী শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করেও পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মজুরি পাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বাড়লেও বাড়েনি শ্রমমূল্য।
ফলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে, আর কিস্তির চাপে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে নারী শ্রমিকের সংখ্যা। মজুরিতে বৈষম্য থাকলেও সংসার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে মাঠে নামছেন আলেয়া বেগমের মতো অনেক গৃহবধূ।
লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বসবাস। এক সময়ের স্বচ্ছল অনেক পরিবার নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রম বিক্রি।
বছরের বিভিন্ন সময়ে এলাকায় কাজ না থাকায় অনেক পরিবার প্রধান ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজের সন্ধানে যান। তবুও এনজিও ঋণের চাপে জর্জরিত হচ্ছে পরিবারগুলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান ক্ষেত পরিচর্যা, আগাম ধান কাটা, মিষ্টি কুমড়া ও মরিচ উত্তোলনের কাজ চলছে।
গঙ্গাচড়ার মহিপুর তিস্তার চরে একসঙ্গে কাজ করছিলেন কয়েকজন নারী শ্রমিক। তারা জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করে তারা মাত্র ৩০০ টাকা মজুরি পান। একই কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
কাকিনা রুদ্রেশ্বর চরের মমেনা, আছিরন নেছা ও আকলিমা বেগম জানান, সংসার চালাতে গিয়ে তারা প্রথমবারের মতো মাঠে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা দিতে হয়, কাজ না করলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চরাঞ্চলে প্রায় কোনো পরিবারই বেসরকারি সংস্থার ঋণের বাইরে নয়। অনেকেই একাধিক সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে ২৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাদের।
কাকিনা চাপারতল এলাকার হাছনা বেগম বলেন, মানুষটা (স্বামী) বাইরে কাজ করে। আমি কাজ করি কিস্তি দিতে। তিনটা গরু পুষি, ক্ষেত থেকে ঘাস কেটে আনি। গত বছর মেয়ের বিয়ের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি, এখন কাজ করে শোধ করছি।
কাকিনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াছিন আলী বলেন, বর্তমানে একজন পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, আর নারী শ্রমিকের ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী রুখশাহানারা মুক্তা বলেন, চরাঞ্চলের পরিবারগুলো এনজিও ঋণের জালে আটকা পড়েছে। সারা বছরই তাদের সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। মজুরিতে বৈষম্য থাকলেও কিস্তির চাপের কারণে দিন দিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।