ইরানে মুদ্রাস্ফীতিকে কেন্দ্র করে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু করেন এক দল ব্যবসায়ী। কয়েক দিনের মধ্যে সেই বিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা ইরানজুড়ে। বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে ইরানে হামলার অজুহাত খুঁজতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এমন এক চরম সংকটের মুখে দেশের হাল ধরতে নিজের অন্যতম বিশ্বস্ত ও অনুগত এক নেতার ওপরই আস্থা রাখেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি হলেন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বর্তমান প্রধান। মূলত তখন থেকেই আড়ালে থেকে ইরান চালাচ্ছেন তিনি।
এক অভিজাত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবারে জন্ম লারিজানির। দীর্ঘ ১২ বছর তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে চীনের সঙ্গে কয়েক শ কোটি ডলারের ২৫ বছর মেয়াদি এক কৌশলগত চুক্তির আলোচনার দায়িত্বও তার কাঁধেই ছিল।
ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিতে সম্প্রতি ইরানে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তা প্রাণঘাতী পন্থায় ও কঠোর হাতে দমনের মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। বর্তমানে দেশটিতে সরকারের যেকোনো বিরোধিতা কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন লারিজানি।
একই সঙ্গে রাশিয়া, কাতার ও ওমানের মতো মিত্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনাও তদারকি করছেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে, তাতে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে, সেই ছকও কষছেন লারিজানি।
চলতি মাসে কাতারের রাজধানী দোহা সফরে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে আলি লারিজানি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে প্রস্তুত আছি। আমরা নিশ্চিতভাবেই আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। গত সাত-আট মাসে আমরা দারুণ প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজেদের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে তার সমাধান করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, গায়ে পড়ে যুদ্ধ শুরুও করব না। তবে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে, আমরা তার কড়া জবাব দেব।’
লারিজানির এই উত্থানে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পেশায় হৃদ্রোগ সার্জন থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া পেজেশকিয়ান ক্ষমতায় বসার পর থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তিনি এখনো প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, ‘আমি একজন চিকিৎসক, রাজনীতিক নই।’ এমনকি কেউ যেন তার কাছে ইরানের হাজারো সমস্যার সমাধান আশা না করেন, সেটাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। সে সময় তিনি তার সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম ঠিক করেন। তাদের নাম অবশ্য কখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তবে এটা প্রায় নিশ্চিত যে ওই তিনজনের মধ্যে লারিজানি নেই। কারণ, তিনি শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা নন, যা কি না ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য এটি অন্যতম প্রধান শর্ত।
তা সত্ত্বেও খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত বলয়ে নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন লারিজানি। সাথে আরও আছেন খামেনির শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা ও রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি। আছেন গার্ডসের আরেক সাবেক কমান্ডার ও বর্তমান পার্লামেন্টের স্পিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
যুদ্ধকালীন সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড সামলাতে গালিবাফকে নিজের কার্যত ‘ডেপুটি’ হিসেবে ঠিক করে রেখেছেন খামেনি। এ ছাড়া এই ঘনিষ্ঠ বলয়ে রয়েছেন খামেনির চিফ অব স্টাফ ও ধর্মীয় নেতা আলি আসগর হেজাজি।
তবে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের কাছে এই নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এর কারণ তাদের অতীত রেকর্ড। কারও বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আছে, কারও বিরুদ্ধে আছে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার অভিযোগ। যেমন অতিসম্প্রতি মাত্র তিন দিনের বিক্ষোভে অন্তত সাত হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।