ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরের ৬টি আসনে ৩৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন ছাড়া বাকি আসনগুলোতে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জয়ের ব্যাপারে সকল প্রার্থী আশাবাদী। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে। ভোটাররা বলছেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এবার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এটাই বড় পাওয়া।
যশোর-১ শার্শা আসনে ৪ প্রার্থী ভোটযুদ্ধে রয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ আজীজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বক্তিয়ার রহমান (হাতপাখা)। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের পর যশোর ১ শার্শা আসনে বিএনপি-জামায়াত ও শরিকদের পুনরায় উত্থানকে রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একাধিক ভোটার জানান, এই আসনে জামায়াতের ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিএনপিরও ভোট কম নয়। প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে আ.লীগ ও সনাতন ধর্মের সমর্থক ভোটারের দিকে।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে ৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার তালিকায় ৮ প্রার্থীর নাম রয়েছে। তারা হলেন বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ইদ্রিস আলী (হাতপাখা), বাসদের প্রার্থী ইমরান খান (মই), স্বতন্ত্র জহুরুল ইসলাম (ঘোড়া), স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান (ফুটবল), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের প্রার্থী শামছুল হক (টেলিভিশন), এবি পার্টির প্রার্থী রিপন মাহমুদ (ঈগল)। তবে ঘোড়া প্রতীকের জহুরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বর্তমানে তিনি ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।
ভোটারদের ভাষ্যমতে, গত চারটি এক তরফা সংসদ নির্বাচনের তিনটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। এসব প্রার্থীদের বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলাতে হলেও তারা ছিলেন ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত। এলাকার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল খুবই কম, যা নিয়ে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝেও ছিল ক্ষোভ। তবে এবার মাঠে আওয়ামী লীগ নেই। এবারের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর সাথে জামায়াত প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, তা মোটামুটি স্পষ্ট। তবে ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলা বিএনপির কয়েক নেতা গোপনে সাবিরা সুলতানার বিরোধিতা করায় জামায়াত প্রার্থীর পাল্লা ভারী রয়েছে। প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মন জয় করে ভোট নেওয়ার চেষ্টায় আছেন।
যশোর-৩ সদর আসনে ভোটযুদ্ধে রয়েছেন ৬ প্রার্থী। তারা হলেন খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বিএনপির প্রার্থী অনন্দ্য ইসলাম অমিত (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল কাদের (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী খবির গাজী (লাঙ্গল), জাগপার প্রার্থী নিজাম উদ্দীন অমিত (চশমা), সিপিবির প্রার্থী রাশেদ খান (কাস্তে)।
সূত্র জানায়, সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তরুণদের কাছে ভালোবাসার আরেক নাম। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের একাংশ অমিতকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার কিছু ভোটার জামায়াত প্রার্থীকেও ভোট দেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে যশোর সদর আসনে অমিতের জয়ের সম্ভাবনা বেশি।
চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলমত নির্বিশেষে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত একজন যোগ্য নেতা। ভোটের মাঠে গেলে তাকে ভোট দেবেন।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম নাজিম উদ্দিন আল আজাদ (মোটরসাইকেল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বায়েজীদ হোসাইন (হাতপাখা), বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গোলাম রসুল (দাঁড়িপাল্লা), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আশেক এলাহী (দেয়ালঘড়ি), জাতীয় পার্টির প্রার্থী জহুরুল হক (লাঙ্গল), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রার্থী সুকতি কুমার মন্ডল (রকেট)।
সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যশোর-৪ আসনে ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব জনপ্রিয় বিএনপি নেতা। তার কর্মীসমর্থকের সংখ্যা বেশি। ঋণখেলাপির কারণে তিনি নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর থেকে তার কর্মীরা হতাশায় ভুগছেন। প্রথমাবস্থায় তারা ধানের শীষের প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজীকে মন থেকে মানতে না পারলেও এখন অনেকে তার পক্ষে ওপর ওপর কাজ করছেন। বাস্তবে তাদের জামায়াত প্রীতি রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু ভোটাররা যদি ধানের শীষের ভোট না দেয় তাহলে এই আসনে জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা আছে।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী রশীদ আহমদ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেন (কলস), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গাজী এনামুল হক (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ হালিম (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন (হাতপাখা)।
সূত্র জানায়, মণিরামপুর আসনে ধানের শীষের প্রার্থী রশীদ আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গাজী এনামুল হক ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেনের মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির দ্বন্দ্বে এখানে জামায়াত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হতে পারে।
সূত্রটি আরও জানায়, প্রথমে এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল শহীদ ইকবাল হোসেনকে। পরে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদার হিসেবে আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় শহীদ ইকবাল হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশ তার পক্ষেই নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
প্রায় পৌনে চার লাখ ভোটার অধ্যুষিত এই আসনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পূজা উদ্যাপন পরিষদ, মতুয়া সংগঠনসহ সাধারণ হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশ যাকে সমর্থন দেবেন, সেই প্রার্থী বিজয়ের হাসির সম্ভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে শহীদ ইকবাল তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য। ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতির কারণে তাকে সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, সংগঠন ও জনসমর্থনহীন একটি দলকে আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। তাদের মতে, ধানের শীষ প্রতীক যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়, তবে তা রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দেবে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা অন্য দুই প্রার্থীর তুলনায় বেশি এগিয়েছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোক্তার আলী (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী জি এম হাসান (লাঙ্গল), এবি পার্টির প্রার্থী মাহমুদ হাসান (ঈগল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শহিদুল ইসলামের প্রতীক (হাতপাখা)।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। অতীতের ১২টি নির্বাচন ও উপনির্বাচনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭ বার বিজয়ী হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির কোনো প্রকাশ্য তৎপরতা নেই। ফলে মাঠের মূল শক্তি এখন বিএনপি ও জামায়াত।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও উপজেলা আমির অধ্যাপক মোক্তার আলী জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তিনি বলেন, আমাদের সাংগঠনিক শক্তি অনেক মজবুত। জনগণ হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত নেতৃত্ব চায়।
অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল হোসেন আজাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবার বিজয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও তা কাটিয়ে উঠে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করছেন তিনি। ফলে তাকে টপকে বিজয় ছিনিয়ে আনা জামায়াত প্রার্থীর জন্য এতটাও সহজ না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে যশোরের ৬টি আসনে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আওয়ামী লীগের নীরব ভোটারদের হাতে। যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই। তাদের বিশাল ‘ভোট ব্যাংক’ যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবে তিনিই বিজয়ের হাসি হাসবেন।
উল্লেখ্য, যশোর জেলায় মোট ভোটার রয়েছে ২৪ লাখ ৭১ হাজার ৯০৮। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৯০৬, মহিলা ১২ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৭ ও হিজড়া ২৫ জন। ৬টি আসনে ৮২৪ কেন্দ্রের ৪ হাজার ৬৭৯ কক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন ৮২৪ প্রিসাইডিং অফিসার, ৪ হাজার ৬৭৯ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, ৯ হাজার ৩৫৮ পোলিং অফিসার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে ৪০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ২ হাজার ৫০০ পুলিশ, ১৮০ স্ট্রাইকিং ফোর্স। আনসারের সদস্য ১০ হাজার ৭১২, সেনাবাহিনী ৮০০ ও বিমান বাহিনীর ৫০ সদস্য, ৬টি আসনে র্যাবের পেট্রোল টিম ১২, বিজিবির ১৫ প্লাটুন।