বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
৯৩ আসনে ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে গণঅধিকার পরিষদ জাতিসংঘ সংস্থার সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল বিএনপিতে যোগ দিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবিত ২০ গ্রেডের নতুন সরকারি বেতন স্কেল দেখে নিন ইবির দুর্নীতি ও অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির ৫৯ নেতাকে বহিষ্কার দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ২৩ বছরের কারাদণ্ড নির্বাচন ও নিরাপত্তা নিয়ে সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন’ প্রতিবেদন পেশ বরিশালে চূড়ান্ত লড়াইয়ে ৩৬ প্রার্থী, পেলেন প্রতীক বরাদ্দ

কম আলোতে ভালো ক্যামেরার মোবাইল

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

সন্ধ্যার পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা, রাতের রাস্তার নিয়ন লাইট, অন্ধকার রেস্তোরাঁয় ডিনারের মুহূর্ত- এসব ধরে রাখতে চাই আমরা সবাই। কিন্তু ফোনের ক্যামেরা খুললেই হতাশা, ছবি কালো বা নয়েজে ভরা। অথচ আশেপাশেই কেউ একজন তুলছেন ঝকঝকে রাতের ছবি, যেন দিনের বেলার মতো পরিষ্কার। পার্থক্য কোথায়? উত্তর হলো লো-লাইট ক্যামেরা টেকনোলজি। আজকের স্মার্টফোন বাজারে কম আলোতে ভালো ছবি তোলার ক্ষমতা একটা বড় বিক্রয় পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলুন বুঝে নিই কোন ফোনে সেরা নাইট ফটোগ্রাফি পাওয়া যায় এবং কেন?

মোবাইল প্রযুক্তির পেছনের বিজ্ঞান

রাতের ছবি ভালো তুলতে হলে শুধু বড় মেগাপিক্সেল থাকলেই হয় না, দরকার বড় সেন্সর সাইজ। ক্যামেরা সেন্সর যত বড়, তত বেশি আলো ক্যাপচার করতে পারে। এজন্য Google Pixel সিরিজ, Samsung S24 Ultra, iPhone 15 Pro Max – এসব ফোনে বড় সেন্সর ব্যবহার করা হয়। Sony IMX989 বা Samsung ISOCELL GN2 এর মতো সেন্সরগুলো ১/১.৩ ইঞ্চি বা তারও বড়। এই সেন্সরগুলো অন্ধকারেও যথেষ্ট পরিমাণ আলো সংগ্রহ করতে পারে।

তারপর আসে অ্যাপারচার বা লেন্স খোলার মাপ। f/1.5 বা f/1.6 অ্যাপারচার মানে লেন্স বেশি খোলা, বেশি আলো ঢুকছে। যত কম এই নম্বর, তত ভালো লো-লাইট পারফরম্যান্স। অনেকটা বড় দরজা দিয়ে বেশি মানুষ ঢুকতে পারার মতো। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইমেজ প্রসেসিং। এখানেই AI এবং কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফির জাদু। ফোন একসাথে কয়েক ডজন ছবি তোলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে, তারপর সেগুলো মিলিয়ে একটা পারফেক্ট ছবি বানায়। নয়েজ কমায়, ডিটেইল বাড়ায়, রঙ ঠিক করে – সব স্বয়ংক্রিয়ভাবে।

Google Pixel

কম আলোতে ছবি তোলার কথা উঠলে প্রথম নাম আসে Google Pixel এর। Pixel 6 থেকে শুরু করে এখনকার Pixel 8 Pro পর্যন্ত সবগুলোতেই নাইট সাইট মোড অসাধারণ। Google এর কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি এত উন্নত যে হার্ডওয়্যার কম শক্তিশালী হলেও সফটওয়্যার দিয়ে দেয়। Pixel এর নাইট সাইট মোড চালু করলে তিন-চার সেকেন্ড ধরে রাখতে হয় ফোন। এই সময়ে ক্যামেরা অনেকগুলো এক্সপোজার নেয়, কিছু ছবি খুব কম আলোতে, কিছু বেশি আলোতে। তারপর Tensor চিপসেটের AI সব ছবি বিশ্লেষণ করে, সেরা অংশগুলো বেছে নিয়ে একটা ছবি তৈরি করে যা দেখে মনে হবে স্টুডিও লাইটিং এ তোলা।

আরেকটা দারুণ ফিচার হলো Astrophotography Mode। এটা দিয়ে রাতের আকাশ, তারা, এমনকি ছায়াপথও ছবি তোলা যায়। ট্রাইপড লাগিয়ে কয়েক মিনিট এক্সপোজার দিলে যে ছবি পাওয়া যায়, তা বিশ্বাস করা কঠিন যে মোবাইল দিয়ে তোলা।

Samsung Galaxy

Samsung তাদের Galaxy S সিরিজ এবং বিশেষ করে Ultra মডেলগুলোতে মাল্টি-ক্যামেরা সেটআপ ব্যবহার করে রাতের ফটোগ্রাফি সামলায়। S24 Ultra তে ২০০MP মেইন সেন্সর আছে যেটা Pixel Binning টেকনোলজি ব্যবহার করে কম আলোতে ১২MP ছবি তোলে। মানে নয়টা পিক্সেল মিলে একটা বড় পিক্সেল তৈরি করে যা বেশি আলো ক্যাপচার করে। Samsung এর Nightography ফিচার শুধু ছবি নয়, ভিডিওতেও কাজ করে। রাতে 4K ভিডিও রেকর্ড করলেও দারুণ পরিষ্কার ফুটেজ পাওয়া যায়। কনসার্ট, বার্থডে পার্টি, রাতের শহর ভ্রমণ – যেকোনো মুহূর্ত ধরে রাখতে পারবেন।

আরেকটা সুবিধা হলো টেলিফটো লেন্সেও OIS এবং নাইট মোড কাজ করে। মানে দূরের কোনো অবজেক্ট রাতে জুম করে তুললেও ঝাঁকুনি কম হয়, ছবি শার্প আসে। এই ফিচার খুব কম ফোনেই আছে। চাঁদের ছবি তুলতে চান? S24 Ultra তে Space Zoom ব্যবহার করে ১০০x পর্যন্ত জুম করা যায় এবং নাইট মোডের সাথে চাঁদের ক্রেটার পর্যন্ত দেখা যায়।

Apple iPhone

Apple তাদের Deep Fusion এবং Photonic Engine দিয়ে লো-লাইট ফটোগ্রাফিতে একটা আলাদা পথ নিয়েছে। iPhone 15 Pro Max এর মেইন ক্যামেরা এবং টেলিফটো উভয়েই রাতে দারুণ পারফরম্যান্স দেয়। Apple এর ফিলসফি হলো ছবি যেন বাস্তবের কাছাকাছি দেখায়, অতিরিক্ত প্রসেসিং না করা। Night Mode আইফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয় যখন আলো কম। আপনাকে কিছু করতে হয় না, ফোন নিজেই বুঝে নেয়। এক্সপোজার টাইম স্ক্রিনে দেখায় – ১ সেকেন্ড, ২ সেকেন্ড বা ৩ সেকেন্ড। ফোন স্থির রাখলে যত বেশি এক্সপোজার, তত ভালো ছবি।

আইফোনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কনসিস্টেন্সি। একবার ভালো ছবি তুললেই হলো না, প্রতিবার ভালো ছবি তুলতে হবে। iPhone এ শতবার ছবি তুললে নিরানব্বই বার ভালো আসবে। এই reliability অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যারা প্রফেশনাল কাজে ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করেন। ProRAW ফরম্যাটে ছবি তুললে পোস্ট-প্রসেসিং এর জন্য অনেক বেশি ডেটা পাওয়া যায়। ফটোগ্রাফাররা এটা পছন্দ করেন কারণ পরে Lightroom বা Photoshop এ এডিট করার সুযোগ থাকে।

Xiaomi এবং Vivo

প্রিমিয়াম ফোনের একচেটিয়া অধিকার নয় আর ভালো নাইট ফটোগ্রাফি। Xiaomi 14 এবং Vivo X100 সিরিজে Leica এবং Zeiss লেন্স পার্টনারশিপ আছে যা দারুণ লো-লাইট পারফরম্যান্স দেয়। Xiaomi 14 Ultra এর ভেরিয়েবল অ্যাপারচার ফিচার রয়েছে যা পরিস্থিতি অনুযায়ী লেন্স খোলা কম-বেশি করে। মিড-রেঞ্জ সেগমেন্টেও Xiaomi Redmi Note 13 Pro+ বা Realme 12 Pro+ এর মতো ফোনে OIS সহ ভালো সেন্সর দেওয়া হচ্ছে। পনেরো-বিশ হাজার টাকায় যে নাইট মোড পারফরম্যান্স পাচ্ছেন, তা কয়েক বছর আগে অকল্পনীয় ছিল।

এসব ফোনে Sony বা Samsung এর ভালো মানের সেন্সর ব্যবহার করা হয়। যদিও ইমেজ প্রসেসিং Pixel বা iPhone এর মতো পলিশড নয়, তবুও সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য যথেষ্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য একদম কাজের।

কম আলোর ছবি ভালো তুলবেন যেভাবে

কম আলোতে ভালো ছবি তুলতে কয়েকটি ধাপ মেনে ছবি তুলতে হয়। এই ধাপ সমূহ হচ্ছে-

প্রথম ধাপ: ভালো ক্যামেরা ফোন থাকলেই হবে না, কিছু টেকনিক জানতে হবে। প্রথমত, ফোন যতটা সম্ভব স্থির রাখুন। নাইট মোড কয়েক সেকেন্ডের এক্সপোজার নেয়, সেসময় নড়লে ছবি ঝাপসা হবে। দেয়াল, টেবিল বা যেকোনো কিছুতে ফোন ঠেকিয়ে ধরুন। ট্রাইপড হলে তো কথাই নেই।

দ্বিতীয় ধাপ: আলোর উৎস খুঁজুন। সম্পূর্ণ অন্ধকারে কোনো ক্যামেরাই ভালো ছবি তুলতে পারে না। রাস্তার বাতি, দোকানের আলো, গাড়ির হেডলাইট বা যেকোনো আলোর উৎস ব্যবহার করুন কম্পোজিশনে। আলোর সাথে খেলা করুন, সিলুয়েট তৈরি করুন, শ্যাডো ব্যবহার করুন।

তৃতীয় ধাপ: ফ্ল্যাশ এড়িয়ে চলুন। ফোনের LED ফ্ল্যাশ দিয়ে তোলা ছবি দেখতে কৃত্রিম লাগে এবং সাবজেক্ট ওয়াশড আউট দেখায়। নাইট মোড ব্যবহার করুন ফ্ল্যাশের বদলে। ফলাফল অনেক ভালো হবে।

চতুর্থ ধাপ: ম্যানুয়াল কন্ট্রোল ব্যবহার করুন যদি আপনার ফোনে প্রো মোড থাকে। ISO এবং শাটার স্পিড নিজে সেট করে পরীক্ষা করুন। ISO বাড়ালে ছবি উজ্জ্বল হয় কিন্তু নয়েজ বাড়ে, শাটার স্পিড কমালে বেশি আলো ঢুকে কিন্তু ফোন স্থির রাখতে হয়।

মিড-রেঞ্জে ভালো অপশন

সবাই তো প্রিমিয়াম ফোন কিনতে পারবেন না। মিড-রেঞ্জ বাজেটে কোন ফোনগুলো ভালো? Google Pixel 7a দারুণ অপশন যদি পাওয়া যায়। Pixel এর নাইট সাইট এই দামেও পাচ্ছেন। Samsung A সিরিজের A54 বা A55 মডেলেও ভালো নাইট মোড আছে। Nothing Phone 2 বা 2a আরেকটা ইন্টারেস্টিং চয়েস। ভালো Sony সেন্সর এবং ক্লিন সফটওয়্যারের কারণে নাইট ফটোগ্রাফি ডিসেন্ট। OnePlus Nord 3 বা Nord CE3 এও OIS সহ ভালো মেইন ক্যামেরা পাবেন।

বিশ হাজারের নিচে iQOO Z সিরিজ বা Realme Narzo সিরিজ দেখতে পারেন। পারফেক্ট নয়, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য যথেষ্ট। মূল কথা হলো OIS আছে কিনা এবং সেন্সর সাইজ কত বড় – এই দুটো দেখলেই বুঝবেন লো-লাইট পারফরম্যান্স কেমন হবে।

কম আলোতে ভালো ছবি তোলার ক্ষমতা এখন আর শুধু প্রিমিয়াম ফোনের বিলাসিতা নয়। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মিড-রেঞ্জ, এমনকি বাজেট ফোনেও ভালো নাইট মোড পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেরা অভিজ্ঞতার জন্য Pixel, iPhone বা Samsung Galaxy S/Ultra সিরিজ এখনও এক ধাপ এগিয়ে।

যখন ফোন কিনতে যাবেন, শোরুমে রাতের বেলা টেস্ট করার সুযোগ চান। অন্ধকার কোণে বা কম আলোতে ছবি তুলে দেখুন। অনলাইন রিভিউতে নাইট মোড স্যাম্পল দেখুন। মনে রাখবেন, দিনের ছবি সব ফোনেই ভালো আসে, আসল পরীক্ষা হয় রাতের ছবিতে। আর একটা ভালো নাইট ক্যামেরা ফোন মানে শুধু ছবি তোলা নয়, মানে হলো জীবনের সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখা যেগুলো অন্ধকারে হারিয়ে যেত।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102