নারীর পর্দা বলতে অনেকেই শুধু মাথার চুল ঢেকে রাখাকে বোঝেন। কিন্তু ইসলামী বিধানে পর্দার বিষয়টি কেবল মাথা ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পোশাকের শালীনতা, সৌন্দর্য ও অলংকার প্রকাশ না করা এবং পরপুরুষের সামনে শরীরের কোন অংশ প্রকাশ করা যাবে—এসব বিষয়ও পর্দার আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। তবে মুখ, হাত ও পায়ের বিধান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান হেফাজত করা এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় এমন অংশের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। একই আয়াতে মাথার কাপড় বুকের ওপর টেনে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। পাশাপাশি গোপন অলংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে পায়ের আঘাতে শব্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
সুরা আহজাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবী (সা.)-এর স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বাইরে বের হওয়ার সময় নিজেদের ওপর চাদরের অংশ টেনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে ‘যা সাধারণত প্রকাশ পায়’—এই অংশের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
শুধু মাথা ঢাকলেই কি পর্দা পূর্ণ হয়?
মাথা ঢেকে রাখা নারীর পর্দার একটি অংশ। পর্দার সঙ্গে শালীন পোশাক পরা, শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখা, সৌন্দর্য ও অলংকার প্রকাশ না করা এবং দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়ও জড়িত। তাই পর্দাকে শুধু মাথার চুল ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ইসলামী বিধানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়।
হাত ও মুখ ঢাকার বিধান কী?
নারীর হাত ও মুখ পরপুরুষের সামনে ঢাকা আবশ্যক কি না—এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উপমহাদেশে অনুসৃত হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, নারীর পুরো শরীর সতরের অন্তর্ভুক্ত হলেও চেহারা ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম। অর্থাৎ নামাজের ক্ষেত্রে এগুলো ঢেকে রাখা ফরজ নয়।
তবে পরপুরুষের সামনে চেহারা ও হাত প্রকাশের বিষয়ে ফিতনার আশঙ্কাকে হানাফি ফকিহরা গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিবেচনায় এগুলো ঢেকে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শাফেয়ি ও হাম্বলি ফিকহের প্রসিদ্ধ মতসহ একাধিক আলেম পরপুরুষের সামনে নারীর চেহারা ও হাত আবৃত রাখার মত দিয়েছেন। ফলে ‘হাত দেখা গেলেই পর্দা লঙ্ঘন হয়েছে’—এমন কথা সর্বসম্মত বিধান হিসেবে বলা ঠিক নয়। এ বিষয়ে ফিকহি মতভেদ রয়েছে।
পা ঢাকার বিধান
পা ঢাকার বিষয়ে সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়। উম্মে সালামা (রা.) জানতে চেয়েছিলেন, নারীর পোশাকের নিচের অংশ কতটুকু ঝুলিয়ে রাখা যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে এক বিঘত পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলেন। উম্মে সালামা (রা.) বলেন, এতে পা অনাবৃত হয়ে যেতে পারে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাত পরিমাণ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমতি দেন এবং এর বেশি করতে নিষেধ করেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৪১১৭)
এই হাদিসের আলোকে হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো, নারীর পা সতরের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ঢেকে রাখা আবশ্যক। তবে হানাফি ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে পায়ের পাতা নিয়ে একাধিক মতও পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়েও ফিকহি বিস্তারিত মতভেদ রয়েছে।
নামাজের সতর ও পরপুরুষের সামনে পর্দা এক নয়
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—নামাজের সময় নারীর সতরের বিধান এবং পরপুরুষের সামনে পর্দার বিধান এক বিষয় নয়। নামাজের সতর নিয়ে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মুখ ও হাতের বিষয়ে যে ব্যতিক্রমের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শর্তসংক্রান্ত। এটিকে সরাসরি পরপুরুষের সামনে পর্দার বিধান হিসেবে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
অর্থাৎ, নামাজে মুখ ও হাত খোলা থাকলে নামাজ সহিহ হওয়ার বিষয়টি এক রকম; আর পরপুরুষের সামনে সেগুলো প্রকাশের বিধান পৃথক একটি ফিকহি বিষয়।