জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) দেশব্যাপী অভিযান, মনিটরিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযান এবং বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিচারক ও বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে মোট ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট সাতটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনিবন্ধিত অবস্থায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, রেফ্রিজারেটরে লেবেলবিহীন মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ এবং ট্রেড লাইসেন্স, খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ ও পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণক প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট তিন লাখ টাকা জরিমানা এবং তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলাতেও নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী অভিযান চলমান রয়েছে। ওই সাত দিনে লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও নীলফামারী জেলায় মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, পোড়া তেল ব্যবহার, অননুমোদিত রাসায়নিক রং ব্যবহার, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার বিচরণ, অনুমোদনহীন ঘি ব্যবহার, বিরিয়ানি তৈরিতে কেওড়াজলের ব্যবহার, পণ্যের গায়ে লেবেল না থাকা এবং নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার উৎপাদনসহ বিভিন্ন অপরাধে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানকে মোট ২০ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পাবনা ও সিলেটে পৃথকভাবে সামারি ট্রায়াল পরিচালিত হয়। পাবনায় বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এবং নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে পরিচালিত অভিযানে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে, সিলেটের বিসিক শিল্পনগরী, খাদিমনগরে অবস্থিত দুটি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনকালে একটি প্রতিষ্ঠানে কোনো দৃশ্যমান অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। অপর প্রতিষ্ঠানে খাদ্য সংরক্ষণ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় সাত দিনের মধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সারাদেশে খাদ্যস্থাপনা মনিটরিং কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৯৬টি খাদ্যস্থাপনায় মনিটরিং পরিচালনা করা হয়।
মনিটরিং কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে নিরাপদ খাদ্যবিধি অনুসরণের বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বহুমুখী প্রচার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। এসব প্রচারণার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং ভোক্তার করণীয় বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।
ওই সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সচেতনতামূলক টিভিসি প্রচারের পাশাপাশি স্ক্রলবার্তা প্রচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারেও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক বিভিন্ন অডিওবার্তা প্রচার করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি, রিলস ও ভিডিওর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে।
চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, গবেষণা, গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যবসায়ী, উৎপাদক, ভোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষের এ ধরনের কার্যক্রম আরও ব্যাপক ও কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকবে।’