রোববার (৩ মে) ‘গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন’ শিরোনামে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ, অপতথ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ছিলেন হাসান জাকীর।
ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, বিদেশ থেকে কাজ করার কারণে সরাসরি চাপ বা হুমকি কম পেলেও দেশে অবস্থানরত সোর্সদের গোপনীয়তা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি করতে সময় লাগে এবং প্রতিটি তথ্য একাধিক ধাপে যাচাই করতে হয় বলে তিনি জানান।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলেন। তার দাবি, কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাংবাদিকদের আটক রাখা উদ্বেগজনক। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সাংবাদিকতার পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্ভর ভুয়া কনটেন্টকে উল্লেখ করেন। তার মতে, বর্তমানে ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট ছাড়া নির্ভুল সংবাদ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের মতো শক্তিশালী রেগুলেটরি বডির উদাহরণ টেনে বাংলাদেশেও একটি স্বাধীন মিডিয়া নজরদারি সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
নারী সাংবাদিকদের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনলাইন হয়রানি, কটূক্তি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক নারী সাংবাদিক পেশায় টিকে থাকতে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের আর্থিক দুরবস্থার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে বেতন অনিয়মিত এবং কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। ফলে সাংবাদিকরা পেশাগত সততা বজায় রাখতে চাইলেও আর্থিক চাপের কারণে সমস্যায় পড়েন। তিনি বলেন, ‘নিরাপদ ও ন্যায্য বেতন কাঠামো ছাড়া মানসম্মত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।’
রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিয়ে তিনি বলেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ, গণমাধ্যম ও প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। তিনি অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সমালোচনা করে বলেন, জনগণের স্বার্থে নীতিনির্ধারণী আলোচনা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া দরকার।
অপরাধ, উগ্রবাদ ও আন্ডারওয়ার্ল্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয় বরং আন্তঃসংযুক্ত। বিভিন্ন চক্র পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নতুন সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি সততা ও নৈতিকতার ওপর জোর দেন। তার মতে, সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা নয়, বরং একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ‘মানুষের আস্থা অর্জনই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় অর্জন,’—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা ও অ্যাকটিভিজম একসাথে মিশে গেলে পেশাগত নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে অনেক সময় সীমাবদ্ধতার কারণে একাধিক ভূমিকা পালন করতে হয়, যা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
আলোচনায় তিনি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য নীতিগত সংস্কার, মালিকানা স্বচ্ছতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।







