প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী মানিক ও তার ছেলে অন্তরের ওপর ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ কিশোর দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় তাদের। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় বাজারজুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে বিক্ষোভে নামেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলার সঙ্গে জড়িতরা পার্শ্ববর্তী দ্বাবরিয়া গ্রামের একটি গোঁয়ার টাইপের পরিবারের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবার এলাকায় দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, অভিযুক্তরা নতুন কোনো অপরাধী নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। ‘তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি’- এমন মন্তব্যও শোনা যায় এলাকাবাসীর মুখে।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সদস্যরা বিগত জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিল। প্রথমদিকে তারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমানের পক্ষে কাজ করে। পরবর্তীতে তারা এনসিপি প্রার্থী সাইফ মোস্তাফিজের পক্ষে সরাসরি প্রচারে অংশ নেয়।
সচেতন মহলের মতে, শাহজাদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে কিশোর গ্যাংয়ের এমন দুঃসাহসিক তৎপরতা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পরোক্ষ মদদ রয়েছে। উল্লেখ্য, শাহজাদপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মিজানুর রহমান এই গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত পরিবারের এক সদস্যকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে (এই ব্যক্তি পরবর্তীতে আওয়ামী আমলে বিতর্কিতভাবে পৌর কমিশনারের পদও বাগিয়েছিলেন)। স্বাধীনতার পরপরই হযরত আলী নামে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছিল বলে দাবি করেন এলাকাবাসী, যা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। আজকের এই নারকীয় ঘটনায়ও ‘চেনি’ নামের যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেও এই পরিবারের সদস্য।
শিক্ষার অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়কেও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
ঘটনার পর শাহজাদপুর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ— কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চলছে বলে তারা দাবি করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভুয়া আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ‘হৃদয়ে শাহজাদপুর’ নামক একটি নাম-পরিচয়হীন আইডি থেকে অনবরত মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। এই আইডিটি একটি প্রপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই ভুয়া আইডির বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
অনেকেই মনে করছেন, শাহজাদপুরকে অশান্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেউ কেউ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
এ ঘটনায় শাহজাদপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং কিশোর গ্যাংয়ের পেছনের ‘গডফাদারদের’ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঘটনার পরপরই শাহজাদপুর বণিক সমিতির সভাপতি ইমদাদুল হক নওশাদ জরুরি সংবাদি সম্মেলন করে এই নারকীয় ও অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দাএবং প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পাশাপাশি শাহজাদপুরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যাতে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
তাদের ভাষায়, ‘যে হাত সাধারণ ব্যবসায়ীর ওপর চাপাতি চালায়, সেই হাত কোনো রাজনৈতিক দলের ঢাল হতে পারে না।’
শান্তিপূর্ণ ও ব্যবসাবান্ধব জনপদ হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুরে এ ধরনের সহিংসতা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি অশনিসংকেত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
শান্ত শাহজাদপুরকে অশান্ত করার অপচেষ্টা রুখে দিতে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়কেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।







