সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। শ্রমিক অধ্যুষিত এ অঞ্চলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লাখো মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত চুরি, ছিনতাই, ভাঙচুর, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও অস্ত্রের মহড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আশুলিয়ার জামগড়া, ভাদাইল, রুপায়ন মাঠ, নাভানা মাঠ, ছয়তলা, গাজিরচট আড়িয়ারার মোড়, উষা পোল্ট্রি এলাকা, চিত্রশাইল, কান্দাইল, বাগবাড়ি, ইউসুফ মার্কেট, জিরাবো, তৈয়্যবপুর, সরকার মার্কেট, নিশ্চন্তপুর ও নারসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা বেড়েছে। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ছে চুরি-ছিনতাই ও মাদকের বেচাকেনা। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া ও গুলির ঘটনার অভিযোগও রয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে জামগড়া এলাকা থেকে ১৪ জন কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হলেও বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য না পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ কাটছে না।
জামগড়ার মোল্লা বাজার এলাকার ভ্যানগাড়ি ব্যবসায়ী মেহেদী অভিযোগ করে বলেন, ‘কিশোর গ্যাং লিডার রাজ কুমার ওরফে রাজু সে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত থেকে এলাকায় নানা অপকর্ম করেছে। এখন বিএনপি আসার পরে সে একই ধরনের কাজ করছে। ব্যবসা করতে হলে তাকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হবে। এতে আমি রাজি না হলে রাজুর নেতৃত্বে সোহাগ ও সুমনসহ তাদের গ্যাংরা আমার দোকানে ভাংচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। থানায় অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কোন ব্যাবস্থা নেয়নি। এখন আমি তাদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
এক চা দোকানি বলেন, ‘হঠাৎ গুলির শব্দে আমরা দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যাই। প্রতিদিন পুলিশ অভিযান চালালে এলাকাটা শান্ত হবে।’
এক নারী ভাড়াটিয়া জানান, ‘দুই দিন পরপর গোলাগুলি হয়। গুলি যদি আমাদের গায়ে লাগে, বিচার পাবো কি না জানি না।’
রিয়াদ নামে এক পোশাক শ্রমিক বলেন, ‘অফিস থেকে ফেরার পথে অস্ত্রের মহড়া দেখে আতঙ্কে দ্রুত সরে যাই।’
এব্যাপারে অভিযুক্ত রাজ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব বড় কারণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিশোরদের ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষায় সম্পৃক্ত করলে তারা কর্মমুখী হবে এবং অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।’
আশুলিয়া থানার ওসি রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘জামগড়া এলাকাকে চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত করতে ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরাফাতুল ইসলাম বলেন, ‘মাঝে মধ্যে গুলির ঘটনার সত্যতা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে জড়িতদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।’
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্যদের আইনের আওতায় এনে অঞ্চলটিকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে।’
এদিকে ঢাকা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, জামগড়া এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের তৎপরতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।