মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি-সংক্রান্ত চাপ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে কিউবা বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রাজধানী হাভানাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কেবল মার্কিন ডলারে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা অধিকাংশ কিউবান নাগরিকের নাগালের বাইরে। একই সঙ্গে জাতীয় মুদ্রা পেসোর মান মাত্র তিন সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
জ্বালানি সংকটের কারণে সরকারি ও বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বাস ও ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে, আবার যেগুলো চলছে সেগুলোর ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে করে সাধারণ মানুষের সামনে কার্যত ‘ভাড়া দিন, না হলে বাড়িতে থাকুন’-এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি একসময় বিকল্প হিসেবে দেখা হওয়া বৈদ্যুতিক যানবাহনও দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অচল হয়ে পড়ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কিউবা তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র অর্ধেক উৎপাদন করতে পেরেছে। ফলে হাভানা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এতে ট্র্যাফিক লাইট অচল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ব্যাহত হচ্ছে পানি সরবরাহ ও জরুরি সেবা।
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে কিউবার সরকার ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবাকে তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর এই ঘোষণা আসে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এ পরিস্থিতিকে ‘অস্বাভাবিক ও গুরুতর হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দিলেও কিউবায় এখনো তেমন কোনো আন্দোলনের চিত্র নেই। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, সংগঠিত বিরোধী শক্তির দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের দেশত্যাগ এর পেছনে বড় কারণ। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
অনেক কিউবান বলছেন, তাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য এখন কেবল টিকে থাকা। খাদ্য, রান্নার জ্বালানি ও পানির মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের সংগ্রাম। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকের মতোই কিউবা আবারও তার ইতিহাসের অন্যতম গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যার ভবিষ্যৎ সমাধান এখনো অনিশ্চিত।