পৃথিবীর অন্যতম সফল প্রাণীগোষ্ঠী পিঁপড়া। ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের এই প্রাণীরা কোনো নেতা, পরিকল্পনা বোর্ড বা নির্দেশনা ছাড়াই লাখ লাখ বছর ধরে এমন সব জটিল কাজ করে যাচ্ছে, যা মানুষের কাছেও বিস্ময়কর। ঘর তৈরি, খাবারের পথ খুঁজে বের করা, বিশাল কলোনি পরিচালনা- সবই তারা করে সম্মিলিতভাবে, অথচ কোনো ‘প্রধান’ ছাড়াই।
আমরা সাধারণত মনে করি রানি পিঁপড়াই পুরো উপনিবেশের শাসক। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। রানি পিঁপড়ার প্রধান কাজ হলো ডিম পাড়া ও নতুন সদস্য জন্ম দেওয়া। কলোনির সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কাজের নির্দেশনায় তার প্রায় কোনো ভূমিকাই নেই।
তাহলে প্রশ্ন আসে- পিঁপড়ার কলোনি চালায় কে বা প্রধান কে? উত্তর: কেউ না, আবার সবাই।
পিঁপড়ার সমাজকে বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থা’- এখানে প্রতিটি পিঁপড়া খুব সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চলে এবং আশপাশের পিঁপড়াদের সঙ্গে রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে।
এই অসংখ্য ছোট ছোট কাজ এক সঙ্গে মিলেই তৈরি করে বিশাল ও জটিল সমন্বয়।
বিষয়টি অনেকটা মানুষের মস্তিষ্কের মতো। একটি নিউরন একা কিছু করতে পারে না, কিন্তু কোটি কোটি নিউরন এক সঙ্গে কাজ করেই তৈরি হয় চিন্তাশক্তি। ঠিক তেমনি একটি পিঁপড়া খুব সীমিত ক্ষমতার হলেও পুরো কলোনি মিলে যেন একটি ‘সুপার অর্গানিজম’ হিসেবে কাজ করে।
পৃথিবীতে পিঁপড়ার সংখ্যা আনুমানিক ২০ কোয়াড্রিলিয়ন। অ্যান্টার্কটিকা বাদে সব মহাদেশেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। ছোট কলোনি থেকে শুরু করে কোটি সদস্যের সুপারকলোনি পর্যন্ত- সব জায়গাতেই তাদের সাফল্যের মূল রহস্য একটাই- দলবদ্ধতা।
তাদের সমাজে দেখা যায় মানুষের সমাজের মতো নানা বৈশিষ্ট্য। যেমন- খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ, পরিবহন নেটওয়ার্ক, বাচ্চাদের সম্মিলিত যত্ন, আহত সঙ্গীদের পরিচর্যা কার ইত্যাদি।
তবে পার্থক্য হলো- মানুষের সমাজে এসব পরিচালনার জন্য থাকে প্রশাসন, ম্যানেজার ও নেতা। পিঁপড়াদের ক্ষেত্রে পুরো ব্যবস্থাটাই চলে বিকেন্দ্রীভূতভাবে।
যখন কোনো কর্মী পিঁপড়া খাবারের উৎস খুঁজে পায়, তখন ফেরার পথে সে ‘ফেরোমন’ নামের রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে যায়। অন্য পিঁপড়ারা সেই গন্ধ অনুসরণ করে একই পথে চলতে থাকে এবং তারাও নতুন করে ফেরোমন ছড়ায়।
ফলে পথটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এভাবেই পুরো কলোনি সম্মিলিতভাবে খাবারের অবস্থান সম্পর্কে ‘জেনে যায়’।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- পিঁপড়ারা প্রায়ই সবচেয়ে ছোট ও কার্যকর পথটি বেছে নিতে পারে।
কারণ ছোট পথে যাতায়াত দ্রুত হয়, ফলে সেখানে বেশি ফেরোমন জমা হয়। দীর্ঘ পথের ফেরোমন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। খুব সাধারণ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পুরো কলোনি সবচেয়ে ভালো পথ নির্বাচন করে ফেলে।
পিঁপড়ার বাসা অনেক সময় অবিশ্বাস্য রকম জটিল হয়। সেখানে থাকে— শিশু লালন-পালনের কক্ষ, খাদ্য সংরক্ষণের জায়গা, বর্জ্য ফেলার আলাদা অংশ।
তবুও কোনো পিঁপড়ার কাছে পুরো বাসার নকশা থাকে না।
তারা কাজ করে ছোট ছোট স্থানীয় সংকেত অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, কালো বাগান পিঁপড়া মাটি খুঁড়ে ছোট ঢেলা তৈরি করে। সেই ঢেলার রাসায়নিক সংকেত অন্য পিঁপড়াদের কাছাকাছি আরও মাটি রাখতে উৎসাহিত করে।
ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে স্তম্ভ, দেয়াল, এমনকি ছাদও।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘স্টিগমার্জি’—যেখানে এক সদস্যের রেখে যাওয়া সংকেত অন্য সদস্যের কাজকে পরিচালিত করে।
এদিকে মানুষের ক্ষেত্রে দল বড় হলে সমন্বয় প্রায়ই কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় কর্মদক্ষতাও কমে যায়- যাকে বলা হয় ‘রিঙ্গেলম্যান প্রভাব’।
কিন্তু পিঁপড়াদের ক্ষেত্রে দেখা যায় সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। তাদের দল যত বড় হয়, সমন্বয় ও কার্যক্ষমতাও তত বাড়তে থাকে।