পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়েছে।রোববার (১৫ মার্চ) দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চ এই নির্বাচনী তপশিল ঘোষণা করেন।
আসাম, কেরালা ও পুন্ডুচেরিতে ভোট ৯ এপ্রিল, তামিলনাড়ুতে ২৩ এপ্রিল, আর পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ভোট হচ্ছে দুই দফায় ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ হবে ১৫২টি আসনে, দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে। ভোটগণনা হবে ৭ মে।
তপশিল ঘোষণার পরে কমিশনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়া হয়। ভোটের দফা, নিরাপত্তা, প্রস্তুতি এবং আচরণবিধি নিয়ে কমিশনের অবস্থানও সেখানেই স্পষ্ট করা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু এবং কেন্দ্রশাসিত পুন্ডুচেরির ভোটের দিনক্ষণও ঘোষণা করেছে।
এই পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ভোটার ১৭ কোটি ৪২ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৯ জন। ভোটপর্ব সামলাতে থাকবে প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার ভোটকেন্দ্র এবং কাজে লাগানো হবে প্রায় ২৫ লাখ কর্মী।
তপশিল ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এখন ভোটের মাঠ আরও জমজমাট হতে চলেছে। শাসক তৃণমূল, প্রধান বিরোধী বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই প্রার্থী বাছাই নিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছে।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, খুব দ্রুতই প্রধান দলগুলোর প্রার্থী তালিকা সামনে আসতে পারে। যা রাজ্যে ভোটের উত্তাপ আরও বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে সবশেষ বিধানসভা ভোট হয়েছিল ২০২১ সালে। সেই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন জিতে ক্ষমতায় ফেরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল ২০১১ সাল থেকে রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে ২০২৬-এর ভোট তাদের কাছে টানা শাসনের আরও একটি বড় পরীক্ষা।
২০২১ সালের ভোটে ক্ষমতায় না এলেও বিজেপি ৭৭টি আসন জিতে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। তারপর থেকে বুথ-স্তরের সংগঠন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বারবার সফর এবং আগাম প্রচারযজ্ঞ সব মিলিয়ে রাজ্যে বিজেপির উপস্থিতি যে আরও সুসংগঠিত হয়েছে, তা স্পষ্ট। ফলে এবারের লড়াইও যে মূলত তৃণমূল বনাম বিজেপির মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হবে, তা এখনই বলা যায়।
ভোটের আগেই রাজ্যের শাসক শিবিরও একের পর এক জনমুখী ঘোষণা সামনে এনেছে। নির্বাচন নির্ঘণ্ট ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ভাতার বকেয়া বা ঝুলে থাকা আবেদনগুলোও মঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার আগেই বেকার যুবকদের জন্য যুবশ্রী-ধাঁচের আর্থিক সহায়তা বাড়িয়ে মাসে ১,৫০০ টাকা দেয়ার সিদ্ধান্তের কথাও সামনে আসে।
অন্যদিকে, রাজ্যের সরকারি কর্মীদের ডিএ-ও ভোটের বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। গত বাজেটে রাজ্য সরকার ৪ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি ঘোষণা করেছিল, যাতে মোট হার দাঁড়ায় ১৮ শতাংশ। আবার গত মাসে সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে। ফলে কর্মচারী-অসন্তোষ, আর্থিক দায় এবং ভোট-পূর্ব বার্তার রাজনীতিও এবার নির্বাচনী আবহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পর্যায়ে ঢুকে পড়ল। একদিকে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল নিজেদের উন্নয়ন, সামাজিক প্রকল্প, ভাতা-বৃদ্ধি এবং সংগঠনের শক্তিকে সামনে রাখবে। অন্যদিকে বিজেপি আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, কর্মসংস্থান এবং পরিবর্তনের স্লোগানকে হাতিয়ার করবে।