বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে এক নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের বার্ষিক পরিকল্পনা থাকলেও বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের ঘাটতি এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে দেশটি দিন দিন জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে, যেখানে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) আজ (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গেল বছরেও (২০২৫) দেশের শিল্প মালিকরা জ্বালানি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলমান রয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি উত্তরণের পথে কয়েকটি বড় বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থবিরতা: প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত দেড় বছরে নতুন কোনো বড় সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। প্রতিযোগিতার অভাব দেখিয়ে পূর্বে অনুমোদিত একাধিক প্রকল্পের চুক্তি বা লেটার্স অব ইন্টেন্ট বাতিল করায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
উচ্চ শুল্কের চাপ: ছাদ-সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) ব্যবস্থা এবং শক্তি সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি— যেমন এলইডি বাল্ব ও ইনভার্টার কম্প্রেসরের যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প উদ্যোক্তারা সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
আমদানিনির্ভরতা ও ব্যয় বৃদ্ধি: নিজস্ব উৎস থেকে জ্বালানি উত্তোলনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে ক্রমেই উচ্চ ব্যয়ের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইইইএফএ’র প্রতিবেদনে কেবল সমস্যার দিকগুলোই নয়, বরং এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে তথ্যভিত্তিক ও কারিগরি দিক থেকে উন্নত একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
নিবন্ধে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সৌর প্যানেল, ইনভার্টার এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশের ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করা, দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই জ্বালানি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা এবং জ্বালানি সাশ্রয় ও অপচয় রোধে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করা।
গবেষণাটিতে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, জ্বালানি রূপান্তরের (এনার্জি ট্রানজিশন) এই প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।