ভোজনের শেষ পাতে দুপচাঁচিয়ার এক হাঁড়ি সরার দই না থাকলে যেন পুরো আয়োজনই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী বগুড়ার এই বিখ্যাত সরার দই সম্প্রতি পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতি। ঐতিহ্য আর স্বাদের অনন্য মেলবন্ধনে এই স্বীকৃতি দুপচাঁচিয়ার দই ব্যবসাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়ার নতুন পথ দেখাচ্ছে। তবে উজ্জ্বল এই সম্ভাবনার মাঝেও বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদনের ঘাটতি ও কিছু অভ্যন্তরীণ সংকট শিল্পটির পূর্ণাঙ্গ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপান্তর
স্বাধীনতার পূর্বে ঘোষ পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে দুপচাঁচিয়ায় দই তৈরির সূচনা হয়। প্রয়াত হারান ঘোষ, পঞ্চ ঘোষ, খোকা ঘোষ ও কালু ঘোষদের মতো কারিগরদের হাত ধরে যে শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশাল এক বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। একসময় কেবল ‘টক দই’ উৎপাদিত হলেও বিগত ৩৫ বছরে স্বাদের বৈচিত্র্য এনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মিষ্টি দই। বর্তমানে জয় দধি ভান্ডার, পলাশ মিষ্টান্ন ও দধি ভান্ডার, দুলালী দই ঘর ও উৎসব দই-মিষ্টি ঘরের মতো অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ এখন যুক্ত হয়েছেন এ পেশায়।
দুপচাঁচিয়ার দই শিল্পের বর্তমান বাণিজ্যিক চিত্র অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
উৎপাদন কেন্দ্র: ১২ থেকে ১৫টি বড় কারখানা।
কর্মসংস্থান: প্রায় ১৫০ জন অভিজ্ঞ কারিগর ও শ্রমিক।
দৈনিক উৎপাদন: ৩৫০ থেকে ৪০০ মণ দই (পাশাপাশি খিরসা, ঘি ও বিভিন্ন মিষ্টি)।
মাসিক লেনদেন: প্রায় ২ কোটি টাকা।
প্রথাগত বাজারের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন দুপচাঁচিয়ার খাঁটি দই।
জিআই স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা
২০২৩ সালের ২৬ জুন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বগুড়ার সরার দইকে জিআই পণ্য হিসেবে অনুমোদন দেয়। এতে করে বিদেশে দই রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন।
অনুমোদন সংকট ও ভোক্তার প্রত্যাশা
সম্ভাবনার উজ্জ্বল আলোর পাশাপাশি বেশকিছু সমস্যাও বিদ্যমান। অভিযোগ রয়েছে, হাতেগোনা ৬-৮টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া উপজেলার অধিকাংশ দই ও মিষ্টির দোকানে বিএসটিআইর বৈধ অনুমোদন নেই। পাশাপাশি দোকানে মূল্য তালিকা না ঝুলানোর অভিযোগও রয়েছে। খাদ্য পরিদর্শক মমতা রানী সাহা জানান, বাজারে ভেজাল প্রতিরোধ ও মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাদ ও গুণগত মানের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি বিএসটিআই অনুমোদন সুনিশ্চিত করা গেলে দুপচাঁচিয়ার দই শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নাম উজ্জ্বল করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের।