প্রতিবছরই বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের নদী তীরবর্তী এলাকার চিত্র। কচাঁ, পানগুছি, বলেশ্বর, কালিগংগা ও সন্ধ্যা নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়কসহ নানা স্থাপনা। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক পরিবার। ভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর।
বর্ষা মৌসুম আসলেই আতঙ্কে থাকেন পিরোজপুরের জিয়ানগরের চন্ডিপুর ইউনিয়নের কলারন ও খোলপটুয়া গ্রামসহ আসপাশের সহস্রাধিক পরিবার। এসব এলাকার মানুষ প্রতিদিনই কতটুকু জমি নদী ভাঙনে বিলীন হয় তা নিয়ে থাকেন চিন্তায়। গত কয়েক বছর বর্ষা মৌসুমে বেড়িবাঁধ ভেঙে নদী এসে দাঁড়িয়েছে কারো কারো বসতভিটার আঙ্গিনায়। এই বর্ষা মৌসুমে এলাকাবাসীর উদ্যোগে বাঁধের কিছু স্থান পুননির্মাণ করা হলেও তা টিকে থাকবে কিনা এই দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন তারা।
এছাড়াও, জেলা সদরের হুলারহাট ও দেওনাখালি, নেছারাবাদের ছারছিনা, কাউখালীর আমড়াঝুড়ি ফেরিঘাট, মঠবাড়িয়ার খেতাচিরা ও মাঝেরচরসহ বিভিন্ন এলাকার লাখো পরিবার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের কারো কারো জায়গা হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পে আবার কেউ চলে গেছেন জীবিকার তাকিদে অন্য কোথাও। বছরের পর বছর ধরে তারা ভাঙনের শিকার হলেও এখনো মেলেনি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পিরোজপুরের সাতটি উপজেলার প্রায় সবগুলোই নদীবেষ্টিত। বর্তমানে ছয়টি পোল্ডারে প্রায় ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদী তীরবর্তী এলাকার কয়েক হাজার পরিবার তাদের সবটুকু হারিয়েছেন নদী ভাঙনে। অধিকাংশ এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকা ও ভাঙা থাকার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে অনেক পরিবার। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ ও সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের পাশাপাশি নদী থেকে বালু উত্তলনেও আপত্তি জানিয়েছেন তারা।
জিয়ানগরের খোলপটুয়া গ্রামের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রী মো. মিজান খান বলেন, বেড়িবাঁধ আছিল (ছিল) আগে কিন্তু ভেঙে গেছে। যতোবারই বেড়িবাঁধ বাধাঁ হয় ভেঙে যায়। এসব ভাঙা বেড়িবাঁধ থেকে পানি ঢুকে কৃষি জমি নষ্ট হয়, ঘরে পানি ওঠে, জমি ভাইঙ্গা যায়। এজন্যই আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্লক দিয়া টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।
ভেঙে যাওয়া নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী
পার্শ্ববর্তী কলারন গ্রামের বাসিন্দা জেলে মো. রাজিব হাওলাদার বলেন, বর্ষ মৌসুম আমাদের কাছে আতঙ্ক হয়ে আসে। নদী ভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হয়। একটাই দাবি আমাদের এই এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ যেন দ্রুত টেকসইভাবে নির্মাণ করা হয়। যাতে আমরা চলাফেরা করতে পারি, কেউ অসুস্থ হলে যেন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যেতে পারি। আমরা দ্রুত ভালো বেড়িবাঁধ চাই। আমাদের পাশে সরকারকে দাড়ানোর অনুরোধ করছি।
উত্তর কলারন গ্রামের বাসিন্দা জেলে মো. মাসুম খান বলেন, আমাগো এখানে সন্ন্যাসী খেয়াঘাট থেকে পথেরহাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ বলেশ্বর নদীতে ভেঙে গেছে। এখানে কলরান, গাজীরহাট বাজার এসব জায়গা থেকে বেড়িবাঁধ ভাঙে বেশি। এই নদীতে অনেক স্রোত তাই বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। একারণে আমাদের বাড়ি ঘর সব তলাইয়া যায়। বর্তমানে হাটাচলায় আমাদের খুব দুষ্কর অবস্থা।
তিনি বলেন, আমরা এলাকাবাসী মিলে কিছু স্থান মেরামত করছি, কিন্তু আবার ভাইঙ্গা যায়। বেড়িবাঁধের বারবার অফিসাররা মাপ যোপ নেয় কিন্তু কাজ হয় না। এখানের বিলে পানি ঢুকে সব সময় তলাইয়া যায় এজন্য কেউ কোনো কৃষি দিতে পারে না। বর্তমানে ধানের বীজ ফালাইছেলে সব বীজ নষ্ট ওইয়া (হয়ে) গেছে, এতে আমাগো লাখ লাখ টাকার ক্ষতি ওইছে (হয়েছে)। মাটির কাচা চুলা পানিতে তলাইয়া যায়। বাচ্চা কাচ্চা নিয়া রান্না করে খাওয়াও দূরাবস্থা।
চন্ডিপুর বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী ও পল্লী চিকিৎসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকাটি বন্যা দুর্গত। পানির চাপে বেড়িবাঁধ প্রতিবছরই ভেঙে যায়। ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়। বিশেষ করে চন্ডিপুর, খোলপটুয়া, কলারন, সন্যাসী এসব এলাকা বেশি দুর্গত। কচা ও পানগুছি নদীর চৌ মোহনা আছে, এজন্য পানির তীব্র চাপে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এলাকার মানুষের একটাই প্রত্যাশা বেড়িবাঁধের রাস্তাগুলো ব্লক দিয়ে টেকসইভাবে করা হোক, যাতে আমাদের ভোগান্তির মধ্যে যেন আর পড়তে না হয়।
নদীভাঙন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল জানান, উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প রয়েছে। স্থানীয়দের মাধ্যমে ভাঙনের খবর বা আবেদন পেলে তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয় এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদেরকে জানিয়েছেন নদী শাসনের জন্য পুরো উপজেলায় ধাপে ধাপে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করবে।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন বলেন, জেলায় ৬টি পোল্ডারের আওতায় মোট ৩৩৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বেড়িবাঁধ রয়েছে। কিছু স্থানে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। এসব বেড়িবাঁধের কোনো স্থানে ভাঙন দেখা দিলে সংসদ সদস্যের ডিও লেটার সাপেক্ষে আমরা জরুরি ভিত্তিতে কাজ করে থাকি। এছাড়া অন্যান্য রাজস্বখাতের আওতায় আমরা কিছু কাজ করি।
তিনি বলেন, পিরোজপুর জেলার সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও কচাঁ নদীর ফিজিবিলিটির কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে আমরা বুঝতে পারব, কোন কোন জায়গায় বেশি ভাঙন রয়েছে। সে আলোকে আমরা একটি ডিপিবি তৈরি করে বোর্ডে দাখিল করব এবং এর পরে আমরা ব্যবস্থা নেব